
ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর চাপ বৃদ্ধির অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে আরও একটি বিমানবাহী রণতরী পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। খবর আলজাজিরার।
শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) হোয়াইট হাউসে দেওয়া এক বক্তব্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, গত সপ্তাহে ওমানে অনুষ্ঠিত ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পরোক্ষ আলোচনার পরও উত্তেজনা বজায় থাকায় খুব শিগগিরই মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’ ক্যারিবীয় অঞ্চল ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে রওনা হবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘প্রয়োজন হলে আমাদের একটি বিশাল বাহিনী এক্ষেত্রে প্রস্তুত থাকবে।’ ইরানের সঙ্গে চলমান আলোচনা সাফল্য পাবে বলে আশা প্রকাশ করলেও তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরান যদি চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তবে তা দেশটির জন্য ‘ভয়াবহ’ হবে।
পরে ট্রাম্প মন্তব্য করেন, ইরানে সরকার পরিবর্তন হলে তা হবে ‘সবচেয়ে ভালো’ ঘটনা। ইরানের সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী আন্দোলনে তেহরানের কঠোর দমন-পীড়নে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর প্রসঙ্গ টেনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘৪৭ বছর ধরে তারা কেবল কথা আর কথাই বলে যাচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে আমরা অনেক প্রাণ হারিয়েছি।’
বিমানবাহী রণতরী জেরাল্ড আর ফোর্ডের এই আসন্ন যাত্রা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান মার্কিন সামরিক শক্তি বৃদ্ধিরই একটি অংশ। এর আগে অবশ্য ‘আব্রাহাম লিংকন’ রণতরী, বেশ কিছু গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার, যুদ্ধবিমান এবং নজরদারি বিমান ওই অঞ্চলে পাঠানো হয়।
ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের কয়েক দিন পরেই ট্রাম্প এসব কথা বললেন। নেতানিয়াহু একটি ‘ভালো চুক্তির’ আশা প্রকাশ করলেও ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে চুক্তির আওতায় না আনা হলে, সেটি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। তবে তেহরান জনসমক্ষে ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে আলোচনার মার্কিন চাপ প্রত্যাখ্যান করেছে।
গত জুনে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে নেতানিয়াহু বারবার সামরিক পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে আসছেন। ওই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ ছদ্মনামে সংক্ষিপ্তভাবে অংশ নিয়ে ইরানের তিনটি পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছিল। ট্রাম্প সে সময় দাবি করেছিলেন, মার্কিন হামলায় ইরানের ওই পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ হয়ে গেছে।
জুনের ওই সংঘাতের পর ওমানে অনুষ্ঠিত পরোক্ষ আলোচনাটি ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রথম বৈঠক। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে বাতিল করা পারমাণবিক চুক্তির (জেসিপিওএ) সম্ভাব্য বিকল্প নিয়ে আগের আলোচনার পথটি ওই যুদ্ধের কারণে থমকে গিয়েছিল।
পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার পরিবর্তে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের শর্তে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোর মধ্যে জেসিপিওএ চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ২০১৮ সালে ট্রাম্পের একতরফাভাবে এই চুক্তি থেকে সরে আসার পর তেহরান চুক্তির সীমা লঙ্ঘন করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করে। যদিও তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দাবি বারবার অস্বীকার করে আসছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুরুতে একটি নতুন চুক্তির চেষ্টা করলেও শিগগিরই ‘শূন্য সমৃদ্ধকরণ’ নীতি গ্রহণ করেন। তবে ইরানি আলোচকরা শুরুতেই তা নাকচ করে দিয়েছিলেন।
আলোচনার নতুন চেষ্টা চললেও জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ সংস্থার (আইএইএ) প্রধান রাফায়েল গ্রোসি ১২ দিনের যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো পরিদর্শনের জন্য ইরানের সম্মতি আদায়ে হিমশিম খাচ্ছেন। মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে গ্রোসি জানান, পরিদর্শকরা ইরানে গেলেও হামলার শিকার হওয়া স্থাপনাগুলোতে যাওয়ার অনুমতি পাননি। তিনি গত বছরের আলোচনার অভিজ্ঞতাকে ‘অপূর্ণ ও অত্যন্ত কঠিন’ হিসেবে অভিহিত করেন।
শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্টের মন্তব্য থেকে একটি বিষয় নিশ্চিত হওয়া গেছে, তিনি ‘জেরাল্ড আর ফোর্ড’ পাঠানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন। এই শক্তিশালী রণতরীটি পারমাণবিক চুল্লিচালিত এবং এটি ৭৫টির বেশি সামরিক বিমান বহন করতে সক্ষম।
এদিকে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো সতর্ক করে বলেছে, গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলার ক্ষতে জর্জরিত এই অঞ্চলে যেকোনো নতুন আক্রমণ আরেকটি বড় আঞ্চলিক সংঘাতের জন্ম দিতে পারে।