
দীর্ঘ প্রায় ১২০ বছরের ইতিহাস ও স্বাদের বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ নেত্রকোণার বিখ্যাত ‘বালিশ মিষ্টি’ দেশের ৫৮তম ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি অর্জন করেছে। এটি এখন শুধু স্থানীয় মিষ্টান্ন নয়, পুরো জাতির ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ স্থান পেয়েছে।
নেত্রকোণা শহরের বারহাট্টা রোডে গড়ায় গয়ানাথ ঘোষ প্রায় এক শতাব্দী আগে প্রথম এই মিষ্টি তৈরি করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৫ সালে ভারতে চলে যাওয়ার আগে দোকানের দায়িত্ব হাতে নেন কর্মচারী নিখিল চন্দ্র মোদক, যিনি দোকানের নাম ‘গয়ানাথ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’ অপরিবর্তিত রেখে তা চালিয়ে যান। ছোট বালিশের মতো দেখতে হওয়ায় মিষ্টির নামকরণ হয় ‘বালিশ মিষ্টি’, যা ক্রেতাদের কাছে এক আবেগের প্রতীক।
বালিশ মিষ্টির স্বাদ ও তৈরির পদ্ধতি অন্যান্য মিষ্টির থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এটি সন্দেশ নয়, রসগোল্লাও নয়, বরং খাঁটি দুধ, ছানা, চিনি ও ময়দার অনন্য মিশ্রণে তৈরি বিশেষ এক মিষ্টি, যা একবার মুখে দিলেই সহজে চিনে নেয়া যায়। তৈরি প্রক্রিয়ায় কারিগরের নিখুঁত দক্ষতা মিষ্টিটিকে আরও অনন্য করে তোলে। মিষ্টি তৈরি হয় দেশীয় গাভীর দুধের ছানা ও ময়দা দিয়ে মণ্ড বানিয়ে, ভাজা ও চিনির গরম রসে ডুবিয়ে রেখে, পরে ক্ষীরের প্রলেপ দিয়ে পরিবেশন করা হয়।
স্থানীয়রা জানান, তারা পরিবারের জন্য এবং নিজেই নিয়মিত এই মিষ্টি ভোগ করেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এটি পরিচিত এবং এখন দেশের বাইরে প্রবাসী নেত্রকোণাবাসীদের হাত ধরে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আমেরিকাতেও পৌঁছে গেছে। এটি নেত্রকোণার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম পরিচায়ক।
২০২৩ সালে নেত্রকোণা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ‘বালিশ মিষ্টি’র জিআই স্বীকৃতির জন্য আবেদন করা হয়। পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদফতর দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর এটি দেশের ৫৮তম জিআই পণ্য হিসেবে ঘোষণা করে।
গয়ানাথ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের কর্ণধার খোকন চন্দ্র মোদক এই অর্জনে গভীর গর্ব প্রকাশ করে বলেন, বালিশ মিষ্টি জিআই স্বীকৃতি পাওয়ায় এটি আমাদের এবং নেত্রকোণা জেলার গৌরব।
এর আগে, ২০২১ সালে নেত্রকোণার দুর্গাপুরের বিজয়পুরের সাদামাটি জিআই স্বীকৃতি পেয়েছিল। এই ধারাবাহিকতায় ‘বালিশ মিষ্টি’ যোগ হলো দেশের ঐতিহ্যের মর্যাদাপূর্ণ তালিকায়।