
বাংলাদেশে কোনো ধরনের চরমপন্থা ও উগ্রবাদের ঠাঁই হবে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধারা এমন এক বাংলাদেশ চেয়েছিলেন যেখানে চরমপন্থার কোনো স্থান থাকবে না এবং ন্যায়পরায়ণতাই হবে শেষ কথা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে আর কাউকে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করতে দেয়া হবে না।
বুধবার (১৫ জুলাই) বিকেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী তার দীর্ঘ বক্তব্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতি পুনর্গঠনে সরকারের নানা পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। কুইক রেন্টাল ও জ্বালানি খাতের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার নিজের পকেট ভারী করার জন্য বিদ্যুৎ খাতকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছিল।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্যের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটি বিল উপস্থাপনকে কেন্দ্র করে আমাদের মধ্যে দ্বিমত থাকতে পারে, কিন্তু সংসদে অত্যন্ত প্রাণবন্ত আলোচনা হয়েছে। বিরোধী দল ও সরকারি দল–উভয় পক্ষই নিজ নিজ চিন্তা উপস্থাপন করতে পেরেছে। এই সংসদ সত্যিই জনগণের সংসদ হয়ে উঠেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা উভয় পক্ষই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বিগত ১৭ বছরে এবং জুলাই বিপ্লবে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের পাশে আমরা সব রকম অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে দাঁড়াব।’জাতীয় সংসদে স্বাক্ষরিত ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে সরকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘৩১ দফা এখন আর কেবল বিএনপির ৩১ দফা নেই, এটি এখন সমগ্র দেশের ৩১ দফা। জুলাই সনদের প্রতিটি দফা বাস্তবায়নে আমরা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ।’দেশের অর্থনীতিকে ঋণনির্ভরতা থেকে বের করে বিনিয়োগনির্ভর করার ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০৩৪ সালের মধ্যে আমরা
বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দেশে পরিণত করতে চাই। কেবল জনশক্তি রফতানি নয়, দেশে ইকো-টুরিজম, তথ্যপ্রযুক্তি ও ব্লু-ইকোনমি (সামুদ্রিক অর্থনীতি) খাতে ১০ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে।’
জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রতিবছর ৫ কোটি করে মোট ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। এই লক্ষ্যে চারা উৎপাদনের জন্য ১০ হাজার নতুন নার্সারি গড়ে তোলা হবে, যা আড়াই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। এ ছাড়া তরুণদের জন্য চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা ও ক্যারিয়ার সেন্টার তৈরির কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
বিগত সরকারের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শিক্ষাকে অটো প্রমোশন ও নকল দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছিল। ফ্যাসিবাদ পরিকল্পিতভাবেই এই কাজটি করেছে। আমরা বিতর্কিত বিষয়গুলো সিলেবাস থেকে সরিয়ে এনে শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও মানসম্মত শিক্ষায় জোর দিচ্ছি। আগামী বাজেটে জিডিপির ৫ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা হবে।’দেশের স্বাস্থ্য খাতকে ‘১০১ ভাগ অসুস্থ’ আখ্যায়িত করে তারেক রহমান বলেন, ‘স্বৈরাচারী সরকার এ দেশের চিকিৎসাব্যবস্থাকে অন্য দেশের হাতে তুলে দিয়েছিল। আমরা স্বাস্থ্য খাতের বাজেট জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করতে চাই। রোগ প্রতিরোধের ওপর জোর দিতে দেশজুড়ে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কাজ শুরু হয়েছে।’
গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে পাঁচটি বিভাগে ২০০ শয্যার পাঁচটি শিশু হাসপাতাল চালু করা হবে বলে জানান তিনি। দেশ থেকে ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই দুর্নীতিকে হাত বেঁধে হোক কিংবা টুঁটি চেপে ধরে হোক–নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার বদ্ধপরিকর। আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে সম্পূর্ণ পেশাদার বাহিনীতে রূপান্তর করতে চাই। এরইমধ্যে ১০ হাজার পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।’
সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়তে দেশের ৩০০ সংসদ সদস্য ও সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় দায়িত্ব নেন, তাহলে পরিবর্তন আনা সম্ভব।
সংসদ অধিবেশন চলাকালীন নিরলস কাজ করা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এক মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অগ্রিম ভাতা দেয়ার জন্য স্পিকারের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
সবশেষে রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের মধ্যে মতভিন্নতা থাকবে, কিন্তু শত্রুতা নয়। বাংলাদেশে আর যাতে কখনও ফ্যাসিবাদ-স্বৈরাচার মাথাচাড়া দিতে না পারে এবং দেশ যাতে কখনও তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত না হয়–এই প্রশ্নে আমাদের সবার মধ্যে জাতীয় ঐক্য রয়েছে।’