
তৈরি পোশাকনির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে এবার দেশের প্রতিটি জেলা থেকে সম্ভাবনাময় পণ্যের তালিকা সংগ্রহ করছে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত যেসব পণ্যের দেশে-বিদেশে বাজার তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে ধাপে ধাপে রপ্তানিযোগ্য শিল্পে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর অংশ হিসেবে দেশের সব জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন সম্ভাবনাময় পণ্য সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছে ইপিবি। জেলা প্রশাসনগুলো স্থানীয় উদ্যোক্তা, উৎপাদক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে এসব তালিকা তৈরি করছে।
ইপিবি কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ থেকে ৮২ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। বছরে প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলারের মোট রপ্তানির মধ্যে তৈরি পোশাকের অবদান প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার। ফলে রপ্তানি আয়ের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি একাধিক সম্ভাবনাময় খাত গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, ইতোমধ্যে দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জেলা তাদের প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এসব প্রতিবেদনে রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে— এমন বিভিন্ন পণ্যের কথা তুলে ধরা হয়েছে। বাকি জেলাগুলোও স্থানীয় উদ্যোক্তা, উৎপাদক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে তথ্য সংগ্রহ করছে।
তিনি বলেন, জেলা থেকে পাওয়া প্রাথমিক তালিকাকেই চূড়ান্ত হিসেবে নেওয়া হবে না। ইপিবি এসব পণ্য কারিগরি দিক থেকে যাচাই করবে। প্রয়োজনে মাঠপর্যায়ে গিয়ে উৎপাদন সক্ষমতা, পণ্যের মান, সরবরাহ ব্যবস্থা, প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা এবং রপ্তানির প্রস্তুতি খতিয়ে দেখা হবে।
ইপিবির এ উদ্যোগে প্রতিটি জেলার নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা ও স্থানীয় সম্পদকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কোনো জেলায় উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানির উপযোগী কি না, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা সম্ভব কি না এবং বিদেশি ক্রেতাদের জন্য নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত উৎপাদন বাড়ানো যাবে কি না— এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
পাশাপাশি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে ওই পণ্যের চাহিদা ও সম্ভাবনাও যাচাই করা হবে। এরপর যেসব পণ্যের টেকসই রপ্তানি সম্ভাবনা রয়েছে, সেগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, শুধু বিভিন্ন জেলায় কী কী পণ্য উৎপাদিত হয়, তা খুঁজে বের করাই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য নয়। বরং কোন পণ্যকে টেকসই রপ্তানি শিল্পে পরিণত করা সম্ভব, সেটিই চিহ্নিত করতে চায় ইপিবি।
এক্ষেত্রে পণ্যের মান উন্নয়ন, উৎপাদনোত্তর ক্ষতি কমানো, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং, আন্তর্জাতিক সনদ, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থা, অর্থায়ন এবং বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে সংযোগ তৈরির মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান জানান, আগামী রোববার খাগড়াছড়ি সফরের মধ্য দিয়ে মাঠপর্যায়ে এ কার্যক্রম শুরু হবে। সেখানে সম্ভাবনাময় পণ্য পর্যালোচনার পাশাপাশি স্থানীয় কৃষকদের প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করা হবে।
তিনি বলেন, খাগড়াছড়ি থেকে প্রাথমিকভাবে আম, আদা, হলুদ ও আনারসসহ চার-পাঁচটি কৃষিপণ্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব পণ্যের রপ্তানি সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। পাশাপাশি স্থানীয় হস্তশিল্পসহ অন্যান্য পণ্যও বিদেশের বাজারে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, ইপিবি সরাসরি উৎপাদকদের সঙ্গে কাজ করতে চায়, যাতে তারা আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পান। বিশেষ করে পণ্যের মান, উৎপাদন পদ্ধতি, প্যাকেজিং এবং বিদেশি বাজারের মানদণ্ড সম্পর্কে তাদের সক্ষমতা বাড়ানো হবে।
রপ্তানির প্রকৃত সম্ভাবনা রয়েছে— এমন পণ্য চিহ্নিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও নীতিগত প্রতিবন্ধকতা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, পণ্যের ধরন ও প্রয়োজন অনুযায়ী হিমাগার, উন্নত সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থা, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেজিং সুবিধা, অর্থায়ন এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের মতো সহায়তা দেওয়া হতে পারে। মৎস্যজাত পণ্যের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে ব্রুড মাল্টিপ্লিকেশন সেন্টার বা মাছের পোনা উৎপাদন ও সরবরাহের অবকাঠামোও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
এসব সহায়তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থা, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং ভবিষ্যতের সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করবে ইপিবি।
মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, তৈরি পোশাক খাতের মাধ্যমে বাংলাদেশ রপ্তানি বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। তবে একটি খাতের ওপর রপ্তানি আয়ের অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি খাতের স্থিতিস্থাপকতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
তাই তৈরি পোশাকের বাইরে নতুন নতুন পণ্য ও খাত চিহ্নিত করে সেগুলোকে ধীরে ধীরে বাণিজ্যিকভাবে সফল রপ্তানি শিল্পে পরিণত করতে চায় ইপিবি।
তিনি বলেন, তৈরি পোশাকের বিকল্প হিসেবে একটি মাত্র খাত গড়ে তোলার প্রয়োজন নেই। বরং কয়েকটি মাঝারি ও বড় আকারের রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব হলে প্রতিটি খাত থেকেই বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় করা যেতে পারে। এতে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয় বাড়ার পাশাপাশি রপ্তানি ঝুঁকিও কমবে।
ইপিবি মনে করছে, জেলা ভিত্তিক এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য, স্থানীয় সম্পদ ও উৎপাদন সক্ষমতাকে নতুন রপ্তানি সম্ভাবনায় রূপ দেওয়া সম্ভব হবে। এর ফলে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি কৃষি, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, হস্তশিল্প, মৎস্যসহ বিভিন্ন খাতে নতুন শিল্প গড়ে উঠতে পারে এবং ধীরে ধীরে বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুড়ি আরও বৈচিত্র্যময় ও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। সূত্র: বাসস