
জামায়াতে ইসলামীকে উদ্দেশ করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, আপনারা জাতির সামনে মিথ্যা কথা বলেন। বলেছেন, আপনাদের অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়ে গিয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা প্রমাণ করেছেন, আপনাদের অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়নি। বাঁচার জন্য আপনারা এখন মিথ্যা কথা বলছেন। যারা নির্বাচনের আগে জনগণের সঙ্গে মিথ্যা কথা বলতে পারে তারা নির্বাচনের পর কী পরিমাণ মিথ্যা কথা বলবে—এটা সহজেই অনুমেয়।
আজ সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) যশোরে প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক সফরে এসে নির্বাচনি জনসভায় তারেক রহমান এসব কথা বলেন।
দুপুরে যশোর উপশহর কলেজ মাঠে এই জনসভার আয়োজন করে যশোর জেলা বিএনপি। সকাল থেকে জনসভাস্থল, পাশে ঈদগাহ মাঠ, বাদশা ফয়সল স্কুল মাঠ ও আশপাশের রাস্তাঘাট বিএনপির নেতা-কর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষের ভিড়ে জনাকীর্ণ হয়ে ওঠে।
এর আগে সকালে খুলনায় নির্বাচনি জনসভায় ভাষণ দিয়ে তারেক রহমান হেলিকপ্টারে দুপুর ২টা ১৮ মিনিটে যশোরের জনসভাস্থল উপশহর কলেজ মাঠের পাশে অবতরণ করেন। এরপর বেলা আড়াইটায় মঞ্চে ওঠেন তিনি। ২টা ৩৭ মিনিটে শুরু করে ৪০ মিনিট বক্তব্য দেন।
তারেক রহমান বলেন, এবার ভোট গণনায় দেরি হতে পারে-এমন কথার কড়া সমালোচনা করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, নির্বাচনকে বিতর্কিত ও বাধাগ্রস্ত করতে তারা উঠেপড়ে লেগেছে। এরা ভোট গণনায় দেরির সুযোগ নিতে চাইলে প্রতিরোধ করতে হবে।
তারেক রহমান আরও বলেন, নতুন গল্প শুনছি ইদানীং, ভোট গণনায় নাকি অনেক বেশি সময় লাগবে। এই দেশের মানুষ হয়তো গত একযুগ ভোট দিতে পারেনি। কিন্তু ভোট দেওয়ার যে অভিজ্ঞতা তাদের নেই তা নয়। ৯১ সালে তারা ভোট দিয়েছে। ৯৬ সালে ভোট দিয়েছে। ২০০১ সালে ভোট দিয়েছে। ভোট গণনা করতে কেমন সময় লাগে বাংলাদেশের মানুষের সে ধারণা আছে।
এক ঘণ্টার এই সংক্ষিপ্ত যশোর সফরে নির্বাচনি জনসভায় বক্তব্যের শেষের দিকে তারেক রহমান যশোর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের সাত জেলা তথা যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, নড়াইল, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা জেলার বিএনপি মনোনীত ২২ প্রার্থীর হাতে ধানের শীষ প্রতীক তুলে দিয়ে তাদের বিজয়ী করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান।
কোনো দলের নাম উল্লেখ না করে তারেক রহমান অভিযোগ করেন, তারা এখন তাদের লোকজনকে মা-বোনদের কাছে পাঠাচ্ছে এনআইডি ও বিকাশ নম্বর নেওয়ার জন্য। তারা নাকি সৎ লোকের শাসন কায়েম করবে। আপনাদের এই প্রস্তাবটাই তো সবচে অসৎ প্রস্তাব। আপনারা অসৎ প্রস্তাব দিয়ে কাজ শুরু করে কীভাবে মনে করেন যে সৎ লোকের শাসন কায়েম করবেন।
তারেক রহমান আরও বলেন, আপনারা সমগ্র জাতির সামনে মিথ্যা কথা বলেন যে আপনাদের অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়ে গিয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা প্রমাণ করেছেন, আপনাদের অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়নি। বাঁচার জন্য আপনারা এখন মিথ্যা কথা বলছেন। যারা নির্বাচনের আগে জনগণের সঙ্গে মিথ্যা কথা বলতে পারে তারা নির্বাচনের পর কী পরিমাণ মিথ্যা কথা বলবে—এটা সহজেই অনুমেয়।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, আজকে নির্বাচনকে বিতর্কিত ও বাধাগ্রস্ত করতে এরা উঠেপড়ে লেগেছে। এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। যাতে কেউ ষড়যন্ত্র করে ভোটের অধিকার আবার কেড়ে নিতে না পারে।
দেশ পুনর্গঠনে নিজের পরিকল্পনার কথা ব্যাখা করার পাশাপাশি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নেও কিছু পরিকল্পনার কথা জানান তারেক রহমান। জনগণের ভোটে সরকার গঠন করতে পারলে যশোরের ফুল যাতে বিদেশে রপ্তানি করা যেতে পারে সে উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি। পাশাপাশি এ অঞ্চলে আখ চাষের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, চিনি কারখানাগুলো আবার সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যশোরের উলাসী খাল খনন উদ্বোধন করেছিলেন। সেই স্মৃতি রোমন্থন করে তারেক রহমান বলেন, বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে আমি নিজেও খাল কাটতে আসব। সেখানে সবাইকে অংশ নিতে হবে। এ ছাড়া যশোর-কুষ্টিয়া অঞ্চলের জিকে প্রকল্প আবার সচল করার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
কারও নাম উল্লেখ না করে তারেক রহমান বলেন, একটি রাজনৈতিক দল দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীকে কীভাবে ঘরের মধ্যে আটকে রাখবে সে ব্যাপারে বলেছে। ওই রাজনৈতিক দলের নেতা দুই দিন আগে পরিষ্কারভাবে কর্মজীবী মা-বোনদের প্রতি যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, তা কলঙ্কজনক।
হজরত খাদিজা (রা.)-এর উদাহরণ দিয়ে তারেক রহমান বলেন, হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর সহধর্মিণী বিবি খাদিজা (রা.) ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। তাই কর্মজীবী নারীদের অপমান করার এখতিয়ার কারও নেই।
তারেক রহমান বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আমরা ধরে নিয়েছিলাম, বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা গুণগত পরিবর্তন হয়েছে, এই মুহূর্তে বাংলাদেশে যে দলগুলো রাজনীতি করছে তারা জনগণের মান-মর্যাদা সম্মান অক্ষুন্ন রেখে কথা বলবে এবং রাজনীতি করবে। কিন্তু আমরা কষ্টের সঙ্গে খেয়াল করলাম একটি রাজনৈতিক দল এই দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী মা-বোনদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে কথা বলা শুরু করল। একটি রাজনৈতিক দল উঠে পড়ে লাগল কীভাবে মা-বোনদের ঘরের ভেতর আটকে রাখা যায়।
তারেক রহমান আরও বলেন, বিএনপি বিশ্বাস করে, দেশকে পুনর্গঠন করে এগিয়ে নিতে দেশের নারী-পুরুষ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কিন্তু আমরা অত্যন্ত কষ্টের সঙ্গে দেখলাম, কয়েকদিন আগে ওই রাজনৈতিক দলের শীর্ষনেতা একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বললেন, নারীদের তারা কোন দৃষ্টিতে দেখেন।
জনগণের ভোটে ও সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে নারীদের ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড দেওয়া হবে জানিয়ে তারেক রহমান এর প্রয়োজনীয়তা ও সুবিধা ব্যাখ্যা করেন। দেশের প্রচুর শিক্ষিত বেকারের কথা উল্লেখ করে তাদের কর্মসংস্থান তৈরিতে বিভিন্ন পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ সাবেরুল হক সাবুর সভাপতিত্বে জনসভায় অন্যদের মধ্যে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক নার্গিস বেগম, দলের খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিতসহ যশোর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেন।