
যে খেলনা শিশুর কান্না থামিয়ে আনন্দ দেয়ার কথা, সেই খেলনার রঙে থাকা সীসা মুখের মাধ্যমে মিশছে শিশুর রক্তে। এমন ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনভাইরনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) প্রতিবেদনে। অন্যদিকে আইসিডিডিআর,বি’র আরেক গবেষণায় উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক চিত্র। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৬ বছরের কম বয়সী প্রায় সাড়ে ৩ কোটি শিশুর শরীরে মাত্রাতিরিক্ত সীসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
যে খেলনা আনন্দ দেয়ার কথা, সেটিই হয়ে উঠছে বিষের উৎস। খেলনার রঙে থাকা সীসা হাত হয়ে মুখে গিয়ে মিশছে শিশুর রক্তে। কিন্তু শিশুদের জন্য এই ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে কতটা সচেতন অভিভাবকরা?
অভিভাবকরা বলেন, বাচ্চারা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই বিষাক্ত পদার্থগুলো সম্পর্কে সবাইকে জানানো দরকার। এসব খেলনা দিয়ে অভিভাবকরাও বাচ্চাদের সঙ্গে খেলে, এতে তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাচ্চারা যেহেতু বারবার মুখে নিচ্ছে, যতই নিষেধ করা হোক তারা আরও বেশি মুখে নেয়, এটা স্বাভাবিক। তাই সবার উচিত এ বিষয়ে সচেতন হওয়া।
গবেষণা সংস্থা এনভাইরনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো) বলছে, কিছু রঙে নিরাপদ সীমার চেয়ে এক হাজার গুণেরও বেশি সীসা পাওয়া গেছে, যা শিশুদের খেলনা ও গৃহস্থালির রঙে ব্যবহার হচ্ছে।
দেশে ৬ বছরের প্রায় সাড়ে ৩ কোটির বেশি শিশুর রক্তে বিষাক্ত ধাতু সীসা পাওয়া যাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে নিম্নমানের এসব খেলনা। যেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ৯০ পিপিএম, সেখানে কিছু খেলনায় পাওয়া যাচ্ছে ১ লাখ পিপিএম-এরও বেশি। এসডো আরও বলছে, শুধু শিশুরাই নয়, ঝুঁকিতে রয়েছেন গর্ভবতী নারীরাও। জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৮ শতাংশ অন্তঃসত্ত্বা নারীর রক্তে সীসার মাত্রা নিরাপদ সীমার ওপরে।
এসডোর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দিকা সুলতানা বলেন, খেলনায় অতিরিক্ত মাত্রায় সীসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বিশেষ করে লাল, হলুদ, সবুজসহ বিভিন্ন রঙের খেলনায় এবং এমনকি সাদাতেও এটি পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের তিন কোটির বেশি শিশুর রক্তে সীসার অতিরিক্ত মাত্রা পাওয়া গেছে। এটি শিশু, বয়স্ক এবং গর্ভবতী নারীদের মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই ক্ষতির মাত্রা এমন যে অনেক ক্ষেত্রে তা আর পুনরুদ্ধারযোগ্য নয়।
ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৫ সালের জরিপ বলছে, দেশে ৬ বছরের কম বয়সী শিশুর প্রায় ৩৮ শতাংশের রক্তে সীসার মাত্রা নিরাপদ সীমার ওপরে, যা সংখ্যার হিসেবে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি শিশু।
এছাড়া আইসিডিডিআর,বি’র গবেষণায় ঢাকার ৬৮ শতাংশ শিশুর রক্তেও বিপজ্জনক মাত্রার সীসা পাওয়া গেছে। আইসিডিডিআর,বি’র গবেষক ড. মাহাবুবুর রহমান বলেন, সারা দেশে সীসার পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। এর মধ্যে ঢাকার শিশুদের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। তাই শিশুদের সীসা থেকে রক্ষা করতে হলে এর উৎসগুলো দ্রুত বন্ধ করতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সীসা দূষণের কারণে বাংলাদেশের শিশুরা প্রায় ২ কোটি আইকিউ পয়েন্ট হারিয়েছে। পিওর আর্থের কান্ট্রি ডিরেক্টর মিতালী দাস বলেন, সীসা দূষণের কারণে বাংলাদেশের শিশুদের প্রায় ২০ মিলিয়ন আইকিউ পয়েন্ট হারিয়ে গেছে। সীসা শুধু পরিবেশ বা স্বাস্থ্য সংকট নয়, বরং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিম্নমানের খেলনা ও পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং কঠোর নজরদারি ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।