News update
  • Bangladesh at ‘High Risk’ From Measles, Warns WHO     |     
  • Dhaka-Seoul Ties Set for Strategic Partnership Push: Envoy     |     
  • BSEC vows investor protection as top priority in IPO reform drive     |     
  • Facebook post triggers tension in Shahbagh JCD-DUCSU brawl      |     
  • Grameen Kalyan plans 300 healthcare centres in 64 districts     |     

পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা বাদ পড়া ৯০ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার এখন অনিশ্চিত

বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা মানবাধিকার 2026-04-08, 6:54am

rgewerwerw-8ee62c0f5c9f7bff3694db3c28e8bd661775609652.jpg




পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে ৯০ লক্ষেরও বেশি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এরা সম্ভবত আর ভোট দিতে পারবেন না, যদিও নাম বাদ যাওয়ার পরে আপিল করার সুযোগ রয়েছে।

কিন্তু নির্বাচন শুরু হতে মাত্র দু সপ্তাহ বাকি আছে, তার মধ্যে ট্রাইব্যুনালে আপিল করে ৯০ লক্ষ মানুষের শুনানি শেষ করে রায় বেরনো প্রায় অসম্ভব বলেই মনে করা হচ্ছে। এদিকে নতুন করে ভোটার তালিকায় নাম তোলার সুযোগও আর নেই।

বাদ যাওয়া নামের সংখ্যা রাজ্যের মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ।

সামাজিক মাধ্যমগুলোতে বহু মানুষ ও সামাজিক কর্মকর্তারা লিখছেন বিপুল সংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার "কেড়ে নেওয়া হল", কেউ আবার লিখছেন, "৯১ লাখ মানুষ ভোট দিতে পারবেন না, তাহলে সেই নির্বাচন কীভাবে সুষ্ঠু ও অবাধ হবে"?

যেসব মানুষের নাম বাদ পড়েছে, তাদের একটা বড় অংশই মুসলমান এবং মতুয়া সম্প্রদায়ের হিন্দু বলে মনে করা হচ্ছে, যদিও এ সংক্রান্ত সম্পূর্ণ তথ্য এখনো বিশ্লেষণ করে উঠতে পারেন নি গবেষকরা।

একজনের ঘটনা নিয়ে গণমাধ্যমে লেখালেখি হচ্ছে, যিনি প্রখ্যাত শিল্পী নন্দলাল বসুর নাতি সুপ্রবুদ্ধ সেন ও তার স্ত্রী দীপা সেন। ঘটনাচক্রে ভারতের সংবিধানের অলংকরণ করেছিলেন শিল্পী নন্দলাল বসু।

সরকারি কর্মচারি, যাদের অনেকে ভোটের কাজে যুক্ত ছিলেন বা বিভিন্ন দলের প্রার্থীদেরও ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার ঘটনা সামনে এসেছে।

রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) শুরু হওয়ার আগে পশ্চিমবঙ্গে মোট ভোটার ছিল প্রায় ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ। সোমবার পর্যন্ত সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ কোটি ৭৫ লক্ষে।

তাদের দাবি, যোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়া সত্ত্বেও তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।

রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক বা সিইও-র দফতরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিবেচনাধীন তালিকা থেকে সবচেয়ে বেশি ভোটার বাদ গেছে মুসলমান অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদ জেলায়।

ওই জেলায় সোমবার পর্যন্ত সাড়ে চার লক্ষেরও বেশি মানুষের নাম বাদ গেছে।

বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যার নিরিখে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষা জেলা উত্তর ২৪ পরগনা। সেখানে সওয়া তিন লাখেরও বেশি ভোটারের নাম কাটা গেছে।

এই জেলাটিতে প্রচুর মুসলমান যেমন আছেন, তেমনই হিন্দু মতুয়া সম্প্রদায়েরও বহু মানুষ বাস করেন।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, এখন পর্যন্ত মোট ৯০,৮৩,৩৪৫ জন ভোটারকে 'ভোট দেওয়ার অযোগ্য' বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এই সংখ্যার মধ্যে প্রায় ৫৮,২০,৮৯৯ জন ভোটারকে ভারতের জাতীয় নির্বাচন কমিশন আগেই 'অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত, মৃত বা নকল' বলে চিহ্নিত করেছিল।

এর পাশাপাশি, ২৮শে ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশন যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছিল, তাতে প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটারকে 'বিবেচনাধীন' রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ, চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের সময়েও ভোটার হিসেবে তাদের যোগ্যতা যাচাই করা যায়নি।

যে ভোটারদের নাম 'বিবেচনাধীন' তালিকায় রাখা হয়েছিল, তাদের মধ্যে প্রায় ৪৫ শতাংশকেও বাদ দেওয়া হয়েছে।

ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে প্রায় ৭০০ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের প্রতিটি বিবেচনাধীন ভোটারের ভোটাধিকার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

ক্রমশ বিবেচনাধীন ভোটারদের মধ্যে যোগ্য ও অযোগ্যদের আলাদা করে চিহ্নিত করে নির্বাচন কমিশন ১৩টি 'সাপ্লিমেন্টারি' এবং 'ডিলিসন' তালিকা প্রকাশ করে।

সোমবার পর্যন্ত ওই ৬০ লক্ষ 'বিচারাধীন' ভোটারের মধ্যে ২৭,১৬,৩৯৩ জনকে 'অযোগ্য' বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ভারতের জাতীয় নির্বাচন কমিশন সোমবার রাজ্যের ১৫২টি বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার তালিকা 'ফ্রিজ' করে দিয়েছে। অর্থাৎ কোনো নতুন ভোটারদের নাম এই আসন্ন নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকায় যোগ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

আইন অনুযায়ী, কোনো আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন পেরিয়ে গেলে, ওই কেন্দ্রে নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত নতুন কোনো নাম ভোটার তালিকায় যোগ করা যায় না।

পশ্চিমবঙ্গে ১৫২টি কেন্দ্রে এই সময়সীমা সোমবারই পেরিয়ে গেছে। বাকি কেন্দ্রগুলিতে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া এবং ভোটার লিস্ট 'ফ্রিজ' করার শেষ দিন ৯ এপ্রিল।

'বাদ পড়া ভোটারদের' এখন কী উপায়?

দেশের শীর্ষ আদালতের নির্দেশে নির্বাচন কমিশন ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে। সেখানে ভোটাররা তাদের নাম বাদ যাওয়ার বিরুদ্ধে আপিল বা আপত্তি জানাতে পারেন।

এই আপিল ট্রাইব্যুনালগুলির নেতৃত্বে রয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারকরা।

ভোটার তালিকা ফ্রিজ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে, সোমবার, রাজ্যের বিভিন্ন জেলা প্রশাসন অফিসের সামনে হাজার হাজার ভোটারকে আপিলের লাইনে অপেক্ষা করতে দেখা গিয়েছে।

এদিকে, বাদ পড়া ভোটাররা নতুন ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্ত করতে পারবেন কিনা, সে বিষয়ে ধোঁয়াশা ছিল অনেকদিন। পশ্চিমবঙ্গের সিইও ৩১শে মার্চ জানিয়ে দিয়েছেন যে সেই সময়সীমাও পেরিয়ে গেছে।

সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ ও দেশের নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৯১ লক্ষ বাদ যাওয়া ভোটারদের আসন্ন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভোটপ্রয়োগ করার সম্ভাবনা কম।

পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর অন্য রাজ্যের তুলনায় আলাদা কীভাবে?

এসআইআর প্রক্রিয়া প্রথম চালু করা হয়েছিল বিহারে। কিন্তু তার পরে, ১২টি রাজ্যে দ্বিতীয় দফার এসআইআরে কিছু পদ্ধতিগত বদল আনা হলেও, পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর অন্য রাজ্যগুলির তুলনায় ভিন্ন ছিল।

তার কারণ মূলত মাইক্রো-অবজার্ভার নিয়োগ এবং ভোটারদের যোগ্যতা যাচাইয়ে বিচারবিভাগকে যুক্ত করা।

কেন্দ্রীয় সরকারের গ্রুপ-বি কর্মীদের মধ্য থেকে নিযুক্ত মাইক্রো-অবজার্ভাররা পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটারদের নথি যাচাইয়ের প্রক্রিয়ার তদারকি করেছেন।

তৃণমূল কংগ্রেসের নেতারা এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছিলেন। তারা এসআইআর চলাকালীন কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের যাচাইয়ের কাজে যুক্ত করা নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন। রাজ্য সরকারি কর্মীদের পাওয়া না যাওয়াও তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে বিবাদের একটি কারণ হয়ে উঠেছিল।

ডিসেম্বরে সংবাদমাধ্যমে তৃণমূল কংগ্রেসের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জী প্রশ্ন করেছিলেন, তামিলনাড়ু বা গুজরাটের মতো রাজ্যে, যেখানে তুলনামূলকভাবে ভোটার বাদ পড়ার হার বেশি, সেখানে কেন মাইক্রো-অবজার্ভার নিযুক্ত করা হয়নি কেন?

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও সামাজিক কর্মকর্তা যোগেন্দ্র ইয়াদভ বিবিসিকে বলেন, "পশ্চিমবঙ্গে এসএইআরের ক্ষেত্রে যা ঘটেছে, তা শুধু বিহার নয়, দেশের বাকি রাজ্যের থেকেও আলাদা। তার কারণ নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টিভঙ্গি এবং সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ।

"নির্বাচন কমিশন এই ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেছিল যে বাংলার ভোটার তালিকায় ভোটারের সংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়ানো রয়েছে। তারা এসআইআর প্রক্রিয়া তদারকির জন্য রাজ্যের বাইরে থেকে একদল কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিয়েছিল রাজ্য সরকারের উপর অনাস্থার কারণে," বলছিলেন মি.ইয়াদভ।

তিনি আরো বলেন, "সুপ্রিম কোর্টও ৬০ লক্ষ মামলার বিবেচনা করার জন্য বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তা নিয়োগ করেছিল। বাংলার ক্ষেত্রে আরেকটি অনন্য বিষয় হল এই ৬০ লক্ষ ভোটারের জন্য করা বিশেষ যাচাই-বাছাই। এসআইআর প্রক্রিয়াটি পশ্চিমবঙ্গের জন্যই তৈরি করা হয়েছিল, বিহার ছিল কেবল একটি পরীক্ষা।"

পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর নিয়ে এতো বিতর্ক কেন?

গত অক্টোবরে ১২টি রাজ্যে এসআইআর শুরু হলেও পশ্চিমবঙ্গে এই প্রক্রিয়া বারবার বিতর্কে জড়িয়েছে।

কলকাতার রাজনৈতিক বিশ্লেষক শুভময় মৈত্র বিবিসিকে বলেন, পশ্চিমবঙ্গ এসআইআর বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল দুটি প্রধান কারণে। এক, ভোটার তালিকায় বিদেশি অনুপ্রবেশকারীদের থাকার অভিযোগ, এবং দুই, এসআইআর প্রক্রিয়া চলাকালীন রাজ্য সরকার, কেন্দ্রীয় সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের মধ্যে তালমিলের অভাবে।

কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি বারবার অভিযোগ করেছে, রাজ্যের ভোটার তালিকায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে আসা এক কোটি 'অনুপ্রবেশকারী' রয়েছেন।

তবে, এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এখনো পর্যন্ত কতজন অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করা গেছে, সেই প্রশ্নের উত্তর ভারতের নির্বাচন কমিশন এখনো পর্যন্ত দেয় নি।

বৈধ ভোটারদের নাম বাদ যাওয়ার আশঙ্কা সম্পর্কেও সাংবাদিকদের প্রশ্নের সদুত্তর দেয়নি কমিশন। বরং, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের দিকে বারবার ইঙ্গিত করেছে।

মি. মৈত্র বলছেন, "পশ্চিমবঙ্গে আন্তর্জাতিক সীমান্ত থাকার কারণে সবসময়ই অনুপ্রবেশকারী নিয়ে একটা প্রশ্ন ছিল। তাছাড়া, এসআইআরের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার, কেন্দ্রীয় সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের মধ্যে কোঅর্ডিনেশনের অভাব ছিল প্রথম থেকে। যখন সংসারে মতবিরোধ হয়, তখন একজন তৃতীয় ব্যক্তির সাহায্য দরকার হয়। এই ক্ষেত্রে যেমন বিচারবিভাগ এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হল।"

তিনি আরও বলেন, সরকারি কাঠামোগুলির মধ্যে সমন্বয় নেই বলে, তার ভুক্তভোগী হচ্ছেন সমাজের দুর্বল ও গরিব মানুষেরা।

চলতি বছরের ২০শে ফেব্রুয়ারি প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন শীর্ষ আদালতের বেঞ্চ লক্ষ্য করেছিল যে রাজ্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে "আস্থার অভাব" রয়েছে। সেইদিনই আদালত ভোটারদের যোগ্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দেয়।

ভোটাররা কী বলছেন?

'বিবেচনাধীন' তালিকায় থাকা কলকাতার আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক মি. সাইফুল্লাহ বিবিসিকে বলছেন, "২০০২ সালের তালিকায় আর ২০২৫ সালের তালিকায় অনেকের নামের বানানে গরমিল হয়েছে। আগের তালিকায় আমার নামে একটি বানান ভুলের জন্যই আমাকে বিবেচনাধীন করা হয়েছে। সংশোধিত নামে আমি এত বছর ভোট দিয়েছি। এখানে আমার কোনও অপরাধ নেই। আমার মা, আমার ভাইয়ের একই অবস্থা। আমার মা যখন কান্নায় ভেঙে পড়ছেন, আমি সামলাতে পারছি না।"

একজন বাদ যাওয়া ভোটার বলছেন, "আমার নাম বাদ গিয়েছে। হয়তো আমি এই আসন্ন নির্বাচনে ভোট দিতে পারব না। কিন্তু আমি দেশের শীর্ষ আদালতে আমার অধিকারের জন্য লড়তে যাব। আমি ট্রাইবুনালে যাব না।"

মালদার এক বাসিন্দা বলছিলেন যে তার স্ত্রী সরকারি কর্মচারী, তার নাম বাদ পড়েছে ভোটার তালিকা থেকে। এমনকি তার শ্বশুরমশাই ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় কার্গিলের যুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন, তারও নাম নেই।

এই পরিবারটি ইসলাম ধর্মাবলম্বী।