
রাজনীতির ক্যারিয়ার ওলটপালট করে দেওয়ার প্রাণঘাতী অস্ত্র হিসেবে বারবার সামনে এসেছে গোপন ক্যামেরা কিংবা স্টিং অপারেশন। প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সাথে সাথে কখনও অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের লুকানো লেন্স, আবার কখনও সরকারি কার্যালয় বা হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ ফাঁস হয়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে বিশ্ব রাজনীতিতে।
নৈতিক স্খলন ও রাজনৈতিক দুর্নীতির প্রমাণ পেয়ে বাধ্য হয়ে পদ ছেড়েছেন এবং বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন, এমন কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনীতিকের আলোচিত কেলেঙ্কারি নিচে তুলে ধরা হলো।
গোপন ক্যামেরায় ধারণকৃত কেলেঙ্কারির কারণে পদ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন- এমনই কয়েকজন প্রভাবশালী বিশ্বনেতা ও রাজনীতিককে নিয়ে এই বিশেষ প্রতিবেদন।
ভারত: জর্জ ফার্নান্দেস ও বঙ্গারু লক্ষ্মণ
ভারতের রাজনীতিতে গোপন ক্যামেরাভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছিল ২০০১ সালে সংবাদমাধ্যম ‘তেহেলকা’ (Tehelka) পরিচালিত ‘অপারেশন ওয়েস্ট এন্ড’।
তেহেলকার সাংবাদিকরা কাল্পনিক অস্ত্র সরবরাহকারী কোম্পানির প্রতিনিধি সেজে গোপন ক্যামেরা নিয়ে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন রাজনীতিকদের কাছে পৌঁছান। ক্যামেরায় রেকর্ড করা ফুটেজে দেখা যায়, প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্নান্দেসের দল ‘সমতা পার্টি’র শীর্ষ নেতৃত্ব ও ক্ষমতাসীন বিজেপি’র তৎকালীন সর্বভারতীয় সভাপতি বঙ্গারু লক্ষ্মণ ঘুষ নিচ্ছেন।
বঙ্গারু লক্ষ্মণ গোপন ক্যামেরায় ঘুষ নেওয়ার দৃশ্য ধরা পড়ার পরই বিজেপির সভাপতির পদ ছাড়তে বাধ্য হন ও পরবর্তী সময়ে আদালতের রায়ে সাজাপ্রাপ্ত হন। অন্যদিকে, পুরো ঘটনায় তৎকালীন অটল বিহারী বাজপেয়ী সরকারের ওপর চরম চাপ তৈরি হওয়ায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্নান্দেসও পদত্যাগ করেন।
২০১৪-২০১৬ সালের মধ্যে সাংবাদিক ম্যাথিউ স্যামুয়েল পরিচালিত ‘নারদ স্টিং অপারেশনে’ দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেসের একাধিক শীর্ষ সারির মন্ত্রী ও সাংসদ একটি কাল্পনিক কোম্পানির সুবিধার জন্য বান্ডিল বান্ডিল নগদ অর্থ নিচ্ছেন। এসব ভিডিও একের পর এক প্রকাশ্যে আসার পর তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে তদন্তে নামে ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই তদন্ত শুরু করে। এতে শোভন চট্টোপাধ্যায়সহ একাধিক প্রভাবশালী মন্ত্রীকে তাদের পদ ছাড়তে হয় ও পরবর্তী সময়ে আদালতে দীর্ঘ আইনি লড়াই ও গ্রেফতারের মুখোমুখি হতে হয়।
দিলীপ সিং জুদেব
দিলীপ সিং জুদেব অটল বিহারী বাজপেয়ী সরকারের কেন্দ্রীয় পরিবেশ ও বন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। ২০০৩ সালে ভারতের ছত্তিশগড় রাজ্য নির্বাচনের ঠিক আগে একটি গোপন ক্যামেরার ভিডিও ফাঁস হয়।
ভিডিওতে দেখা যায়, প্রতিমন্ত্রী জুদেব এক কাল্পনিক অস্ট্রেলীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করছেন ও বলছেন, পয়সা খোদা তো নেহি, পার খোদা সে কম ভি নেহি (টাকা খোদা নয়, আবার খোদার চেয়ে কমও নয়)।
ভিডিওটি সামনে আসার পর রাজনৈতিক ভাবমূর্তি রক্ষা করতে এবং তোপের মুখে পড়ে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
যুক্তরাষ্ট্র: হ্যারিসন উইলিয়ামস
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে চালানো সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত স্টিং অপারেশন ছিল এফবিআই (FBI)-এর ‘অ্যাবস্ক্যাম’ (Abscam)।
১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে এফবিআই একটি ভুয়া কোম্পানি ও একজন কাল্পনিক আরব ধনকুবের (শেখ) সাজিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের গোপন লেনদেনের পরীক্ষা নেয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি গোপন ক্যামেরা ও মাইক্রোফোনে রেকর্ড করা হয়। ফুটেজে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ভিসা ও ব্যবসায়িক সুবিধার বিনিময়ে অনেক রাজনীতিক ঘুষ গ্রহণ করছেন।
এই ঘটনার সূত্র ধরে নিউ জার্সির প্রভাবশালী সিনেটর হ্যারিসন এ. উইলিয়ামস সিনেট থেকে বহিষ্কার এড়াতে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এছাড়া মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের বেশ কয়েকজন সদস্য পদ হারান এবং বিচারে দোষী সাব্যস্ত হন।
অস্ট্রিয়া: হাভাঞ্জ-ক্রিস্টিয়ান স্ট্রাখ
২০১৯ সালে ইউরোপীয় রাজনীতিতে ঘটে যাওয়া অন্যতম বড় কেলেঙ্কারি হলো অস্ট্রিয়ার ‘ইবিজা অ্যাফেয়ার’ (Ibiza Affair)।
২০১৭ সালে স্পেনের ইবিজা দ্বীপে গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা একটি ভিডিও ২০১৯ সালে প্রকাশ্যে আসে। সেখানে দেখা যায়, অস্ট্রিয়ার তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর (উপ-প্রধানমন্ত্রী) ও চরম ডানপন্থি রাজনীতিবিদ হাভাঞ্জ-ক্রিস্টিয়ান স্ট্রাখ একজন নারীকে অস্ট্রিয়ার প্রধান সংবাদপত্রের বড় শেয়ার কিনে দেওয়ার বিনিময়ে সরকারি ড্রাইভিং চুক্তি ও সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। নারীটি নিজেকে একজন রুশ ধনকুবেরের আত্মীয়া হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন।
ভিডিওটি ফাঁস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। স্ট্রাখ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন ও তৎকালীন চ্যান্সেলর সেবাস্তিয়ান কুর্স পুরো সরকার ভেঙে দিয়ে আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন।
২০১৫ সালে যুক্তরাজ্যের ডেইলি টেলিগ্রাফ ও চ্যানেল ৪-এর সাংবাদিকরা একটি ভুয়া হংকংভিত্তিক কোম্পানির প্রতিনিধি সেজে গোপন ক্যামেরা নিয়ে দেশটির গোয়েন্দা বিষয়ক সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান ম্যালকম রিফকাইন্ড ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাক স্ট্র’র মুখোমুখি হন। ক্যামেরায় ধরা পড়ে যে তারা অর্থের বিনিময়ে ওই কোম্পানির জন্য সংসদে প্রভাব খাটানো ও বিশেষ সুবিধা দেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছেন।
ভিডিওটি সম্প্রচারিত হওয়ার পর যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়। ম্যালকম রিফকাইন্ড সংসদীয় গোয়েন্দা কমিটির প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন ও সংসদীয় রাজনীতি থেকে বিদায় ঘোষণা করেন।
প্যাট্রিক মার্সার (ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্য, কনজারভেটিভ পার্টি)
২০১৩ সালে বিবিসি ‘প্যানোরামা’ ও দ্য নিউজের গোপন ক্যামেরায় ধরা পড়ে যে, প্যাট্রিক মার্সার অর্থ গ্রহণের বিনিময়ে সংসদে বিশেষ দেশের (ফিজি) স্বার্থে প্রশ্ন উত্থাপন ও সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। গোপন ক্যামেরার ফুটেজ প্রকাশ্যে আসার পর তিনি পদত্যাগ করেন ও কনজারভেটিভ পার্টি থেকেও বরখাস্ত হন।
স্টিফেন বায়ার্স, জেফ হুন ও প্যাট্রিশিয়া হিউইট (যুক্তরাজ্যের সাবেক তিন মন্ত্রী)
২০১০ সালে দ্য সানডে টাইমসের সাংবাদিকরা লবিস্ট বা দালাল সেজে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন ও গোপন ক্যামেরায় রেকর্ড করেন। স্টিফেন বায়ার্স নিজেকে ‘ট্যাক্সি ক্যাব’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, অর্থের বিনিময়ে তাকে যে যে কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে।
ক্যাবিনেটের গোপন তথ্য ও প্রভাব বিক্রির অভিযোগে তাদের তিনজনকেই লেবার পার্টি থেকে বরখাস্ত করা হয় ও পরে তাদের পার্লামেন্টে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
ম্যাট হ্যানকক
করোনাভাইরাস মহামারি চলাকালীন যুক্তরাজ্যে যখন পুরো দেশ কঠোর লকডাউনে আবদ্ধ, তখন নিজের তৈরি সামাজিক দূরত্বের নিয়ম ভঙ্গ করে তোপের মুখে পড়েন তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাট হ্যানকক।
২০২১ সালের জুন মাসে যুক্তরাজ্যের দ্য সান পত্রিকা একটি সিসিটিভি বা গোপন ক্যামেরার ফুটেজ প্রকাশ করে। ভিডিওটি ছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে হ্যানককের নিজস্ব কার্যালয়ের। সেখানে দেখা যায়, তিনি নিজের তৈরি সামাজিক দূরত্ব ও বিধিনিষেধ ভঙ্গ করে এক নারী সহকর্মীকে জড়িয়ে ধরছেন ও চুম্বন করছেন।
একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রী হয়ে নিজের তৈরি স্বাস্থ্যবিধি নিজেই অমান্য করার বিষয়টি সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম অসন্তোষ তৈরি করে। নৈতিকতার স্বার্থে ও জনরোষের মুখে ম্যাট হ্যানকক স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, দ্য লোকাল অস্ট্রিয়া, ওয়েলস অনলাইন, ইবিএসসিও, এনসাইক্লোপিডিয়া,