
বাহরাইনে এক প্রবাসীর বাসায় পোস্টাল ব্যালটের অনেকগুলো খাম গণনার একটি ভিডিও ব্যাপক ভাইরাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এরই মধ্যে তীব্র আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে ঘটনাটি। এমনকি বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে আইনি ব্যবস্থা দাবি করেছে বিএনপি। তুমুল বিতর্কের মুখে অবশেষে ঘটনাটি নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছে ইসি।
এ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বুধবার (১৪ জানুয়ারি) ইসি সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ বলেছেন, সেখানে ১৬০টি ব্যালট ছিল। কোনো খাম খোলা হয়েছে, এ রকম কিছু ভিডিওতে দেখা যায়নি। বিষয়টি বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত দেখছেন।
এছাড়া, পোস্টাল ব্যালট বিতরণে অনুসরণীয় পদ্ধতির ব্যতিক্রম হয়েছে কি না, বাহরাইনের ডাক বিভাগ (বাহরাইন পোস্ট) তা তদন্ত করে জানাবে বলেও জানান তিনি।
ইসি সচিব বলেন, পোস্টাল ভোটের ব্যালট পাওয়ার আনন্দ ধরে রাখতে কেউ এটি ভিডিও করে পোস্ট করেছেন। তবে, এটি করা উচিত হয়নি বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে আখতার আহমেদ বলেন, ছাত্রজীবনে হোস্টেলে যেমন একটা জায়গায় চিঠিপত্র রেখে যেত, একটা টেবিলের ওপরে, আমরা সেখান থেকে নিজেরা নিজেরা নিয়ে নিতাম। সে রকম একটা বাক্সে ১৬০টি ব্যালট দিয়ে গেছে। ওই বাক্সটা যখন বাংলাদেশি প্রবাসী ভাইয়েরা এসে খুলেছেন, চার–পাঁচজন, তখন তারা ওটা ভাগ করে যে আমার পাশের ঘরে থাকে ও, আমি এটা নিচ্ছি। আমি ওটা পৌঁছে দেবো। ব্যাপারটা এরকম।
তিনি বলেন, বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে বাহরাইন পোস্টকে জানানো হয়েছে। তারা সরেজমিন তদন্ত করে জানাবে, এটা কেন ঘটল। তাদের যে পদ্ধতি অনুসরণ করার কথা ছিল, সেখানে কোনো ব্যতিক্রম হয়েছে কি না।
পোস্টাল ব্যালট নিয়ে বিএনপি অভিযোগ করেছে, পোস্টাল ব্যালটে ধানের শীষ প্রতীক এমনভাবে রাখা হয়েছে প্রতীকের মাঝখানে ভাঁজ পড়ছে। এটা ইচ্ছাকৃত কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব বলেন, আমি যতটুকু জানি, তা হলো—প্রতীকের যে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতায় পোস্টাল ব্যালটে প্রতীকের ক্রম সাজানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, বিতর্কের ঝড় তোলা ৭ মিনিট ৩২ সেকেন্ডের ভাইরাল ভিডিওটিতে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অনেকগুলো পোস্টাল ব্যালট গুনছেন একটি বাসায়। আর সেইসব পোস্টাল ব্যালটের খামে ঠিকানা লেখা রয়েছে বাহরাইনের।
ভিডিওতে শোনা যায়, একজন ব্যক্তি ভিডিওকারীকে বাধা দিয়ে বলছেন, ‘এই দাঁড়ান, আপনি ভিডিও করছেন কিসের জন্য? এখানে উনারা মেইন ভিডিও করছে। কেন আপনারা আরও ভিডিও করছেন। আপনারা এখান থেকে যেগুলা আছে সব লইয়া যানগা। আমরার দরকার নাই। কিন্তু, ভিডিও কইরেন না। ফেসবুকে ছাড়িয়েন না।’
অপর দিক থেকে একজন বলছেন, ‘ডিস্টার্ব কইরো না, কেউ ফেসবুকে ছাড়বে না।’
তখন ভিডিও ধারণে বাধাদানকারী ব্যক্তি বলছেন, ‘আমরা এগুলো (পোস্টাল ব্যালট) যাচ্ছি আর আনছি না। এগুলো আমাদের দিয়ে গেছে। এখানে আমার দাদিরা ছিল। আপনারা এখানে যা আছে সব লইয়া যানগা।’
একপর্যায়ে এক ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, ‘একাধিক জন ভিডিও করলে তা ফেসবুকে ছড়িয়ে যাবে। তখন ভাবমূর্তির ক্ষতি হবে। বাহরাইনে প্রবাসীদের দেওয়া পোস্টাল ব্যালটে ভোট বন্ধ হয়ে যেতে পারে।’
ফ্যাক্ট চেক করে দেখা যায়, পোস্টাল ব্যালটের ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি নয়। ভিডিওটিও বাহরাইনে জামায়াতের একজনের বাসার বলে দাবি করছেন কেউ কেউ।
ফেসবুকে এমন আরও একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে, যেটি ২৭ সেকেন্ডের। সেখানেও অনেকগুলো পোস্টাল ব্যালট গুনতে দেখা যায় কয়েকজন ব্যক্তিকে। জুনায়েন বিন সাদ নামের এক ব্যক্তি ভিডিওটি পোস্ট করে লিখেছেন, এটা ওমানে জামায়াতের এক ব্যক্তির বাসার ভিডিও। ২৭ সেকেন্ডের এই ভিডিওটিতে চট্টগ্রাম–৩ আসনের কথা বলতে শোনা যায়।
গত মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) বিকেলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আগারগাঁও নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ে গিয়েছিলেন নজরুল ইসলাম খানসহ বিএনপির চারজন প্রতিনিধি। সোয়া এক ঘণ্টা ধরে চলা এই বৈঠকে বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে পোস্টাল ব্যালটের বিষয়টিও তোলে বিএনপি।
দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম খান পরে সাংবাদিকদের বলেন, বাহরাইনে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের নেতারা অনেকগুলো ব্যালট পেপার ‘হ্যান্ডেল’ করছেন। এটার ভিডিও ভাইরাল হয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশন বলেছে, এটা তাদের নজরে এসেছে এবং তারা বাহরাইনে রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।
নজরুল ইসলাম খান বলেন, ইসি আশ্বস্ত করেছে যে এ ব্যাপারে আরও তদন্ত করে তারা প্রতিবেদন দেবে এবং সে অনুযায়ী তারা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, যদি কেউ এই ভোটে কোনো রকমের কারচুপির চেষ্টা করে, তাহলে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও ভোটার তালিকায় ব্লক করা হবে। এই নির্বাচনকে বিঘ্নিত করার জন্য যারা কারচুপি করার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।