
ল্যাংটাং লিরুং পর্বত থেকে পাহাড়ি ধস ও তিশূলী নদীতে সৃষ্ট প্রলয়ঙ্কারী প্লাবনের তাণ্ডব।
নেপালে ভয়াবহ প্রলয়ঙ্কারী প্লাবন দেখা দিয়েছে। কাঠমান্ডু থেকে ৪৫ কিলোমিটার উত্তরে ল্যাংটাং লিরু পর্বতে হিমবাহ ধস নামে। সেখান থেকেই এই বিপর্যয়ের সূচনা। বন্যায় মৃতের সংখ্যা ১৬০ জন ছাড়িয়েছে। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে শঙ্কা করা হচ্ছে।
প্ল্যানেট ল্যাবসের উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা ঘটনার কারণ নিশ্চিত করেছেন। খবর নেপাল টাইমসের।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বুধবার (২৭ আগস্ট) স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে চীন সীমান্তের কাছে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূকম্পনের সঙ্গে সঙ্গে ল্যাংটাং পর্বতের উত্তর পিঠে এক ভয়াবহ হিমবাহ ধস ঘটে। নেপালের অভ্যন্তরে অবস্থিত এই পর্বত থেকে ধসে পড়া বিশাল বর্জ্য ও পাথর বর্ষায় স্ফীত এবং নেপাল-চীন সীমান্ত নির্ধারণকারী লেন্দে খোলা নদীর গতিপথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে ফেলে। পরে সেখানে তৈরি হওয়া কৃত্রিম হ্রদটি ফেটে গেলে পলি, পাথর ও কাদার এক দানবীয় ঢল তিশূলী নদী দিয়ে নেপালের দিকে প্রবল বেগে ধাবিত হয়।
প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন, ধসের কারণেই এই বিপর্যয়। তবে ভূকম্পন ধস ঘটিয়েছে নাকি বিশালাকার ধসটিই ভূকম্পিক তরঙ্গ তৈরি করেছে, তা নিয়ে এখনও বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে পর্বতের বরফ এমনিতেই ভঙ্গুর ছিল এবং বর্ষার শেষভাগে পাহাড়ের ঢাল ভারি হয়ে পড়ায় ও পারমাফ্রস্ট সিক্ত থাকায় এই ধস চরম রূপ নেয়।
হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণ, পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়া ও মোরেন ধসের ফলে এমন আন্তঃসীমান্ত বিপর্যয় প্রতিনিয়ত বাড়ছে। অতীতে চামোল (২০২১), মেলামচি (২০২১), সিকিম (২০২৩), থামে (২০২৪) এবং গত ২০২৫ সালের ভোতে কোশী প্লাবনের ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালেও বর্ষাকালেই একই ধরনের প্রাকৃতিক মহাবিপর্যয় ঘটল।
উল্লেখ্য, গত ২০২৫ সালের ৮ জুলাইয়ের বন্যায় ১৮ জন নিহত হন। নেপাল-চীন বাণিজ্যের প্রধান সীমান্ত চেকপয়েন্টসহ অবকাঠামো ধ্বংস হয়। সেবার চীনের পক্ষ থেকে নেপালকে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার কোনো সতর্কবার্তাই দেওয়া হয়নি এবং ধসের উৎপত্তিস্থল সীমান্তের খুব কাছে হওয়ায় রাসুয়া চেকপয়েন্টে কাদার ঢল পৌঁছাতে মাত্র কয়েক মিনিট সময় পায়।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকাল পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে সরকারিভাবে মৃতের সংখ্যা ১৬০ জন ছাড়িয়ে গেছে। এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নেপালের নওয়ালপরাসী জেলায় ঘটনার প্রায় ২০০ কিলোমিটার ভাটিতে নারায়ণী নদীতে মানুষ ও গবাদিপশুর মরদেহ এবং ধ্বংসাবশেষ ভেসে আসতে দেখা গেছে।
এই আকস্মিক প্লাবনে নেপালের অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে কয়েক বিলিয়ন ডলার। মাত্র কয়েক মিনিটে ভোতে কোশী ও তিশূলী নদীর ওপর নির্মিত অন্তত ৬টি প্রধান জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ও সাবস্টেশন ধ্বংস বা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া নোয়াকোট জেলায় নির্মিত ২৫ মেগাওয়াটের জাতীয় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পলিমাটিতে পুরোদমে চাপা পড়েছে। একই সঙ্গে নির্মাণাধীন বেশ কিছু প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ভোতে কোশী ও তিশূলী নদীর ওপর ৭০ কিলোমিটার ভাটি পর্যন্ত থাকা অন্তত এক ডজন সেতু ভেসে যাওয়ায় উত্তরের মহাসড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।