
ভয়াবহ ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত ভেনেজুয়েলায় ধ্বংসস্তূপের নিচে টানা ছয় দিন আটকে থাকার পর জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে তিন বছরের এক শিশুকে। শিশুটির নাম ক্লেইবার মোরান। দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ এ ঘটনাকে ‘আশার প্রতীক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
স্থানীয় সময় আজ বুধবার (১ জুলাই) জর্ডানের একটি উদ্ধারকারী দল লা গুয়াইরা রাজ্যের একটি ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে শিশুটিকে জীবিত উদ্ধার করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, উদ্ধারকর্মীরা উল্লাসের মধ্য দিয়ে শিশুটিকে ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করে আনছেন। খবর বিবিসির।
জর্ডানের সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, উদ্ধার করার পরপরই শিশুটিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং পরে রাজধানী কারাকাসের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দেশটির জাতীয় পরিষদের (ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি) প্রেসিডেন্ট হোর্হে রদ্রিগেজ জানান, শিশুটির শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল এবং তার গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক সূচক (ভাইটাল সাইন) স্বাভাবিক রয়েছে।
গত সপ্তাহে ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলায় এখন পর্যন্ত এক হাজার ৯৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ১০ হাজারের বেশি মানুষ। এছাড়া এখনও দশ হাজারেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছে, ভূমিকম্পে ৫৮ হাজার ৮৭০টিরও বেশি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে।
সাধারণত ভূমিকম্পের পর প্রথম ৭২ ঘণ্টাকে ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষকে জীবিত উদ্ধারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে ধরা হয়। সেই সময়সীমা পেরিয়ে ছয় দিন পর একটি শিশুকে জীবিত উদ্ধার হওয়ায় নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে উদ্ধারকারী দলগুলোর মধ্যে।
হোর্হে রদ্রিগেজ বলেন, ক্লেইবারের উদ্ধার প্রমাণ করে যে এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত মানুষ থাকতে পারেন। তাই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলো অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, লা গুয়াইরা অঞ্চলে খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ, পানি ও যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে এবং জরুরি সহায়তা পৌঁছাতে বড় ধরনের বাধার সৃষ্টি হয়েছে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, আগামী ছয় মাসের জন্য ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত অন্তত ৩০ হাজার মানুষের জন্য খাদ্য, অস্থায়ী আশ্রয় ও জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করতে প্রাথমিকভাবে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার প্রয়োজন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সতর্ক করে বলেছে, স্বাস্থ্যব্যবস্থা চরম চাপের মুখে রয়েছে। টিকাদানের নিম্নহার এবং স্বাস্থ্যসেবার সংকটের কারণে হাম, ডিপথেরিয়াসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়েছে।
উদ্ধারকাজে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো, জর্ডানসহ বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকারী দল, প্রশিক্ষিত অনুসন্ধানী কুকুর এবং ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করছে।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, ইতোমধ্যে ৪৭ টন মানবিক সহায়তা ভেনেজুয়েলায় পৌঁছেছে। এতে জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম, নিরাপদ প্রসবের কিট, নবজাতকের চিকিৎসাসামগ্রী এবং সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় উপকরণ রয়েছে।
এদিকে, যেসব মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, তাদের সমাহিত শুরু করেছেন স্বজনরা। তবে এখনও হাজারো পরিবার ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা স্বজনদের খোঁজে অপেক্ষা করছে।
লা গুয়াইরার অস্থায়ী মর্গের সামনে অপেক্ষমাণ উইলকার মোলালা বলেন, আমাদের পরিবারে ১১ জন ছিল। আমি ও আরেকজন কাজে বাইরে থাকায় বেঁচে গেছি। বাকিদের এখনও খুঁজে পাইনি।