
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি— বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠের উত্তাপ এখন তুঙ্গে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জনসভা করে ভোটারদের দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। তবে প্রচারণার শুরুতে দুই দলের মধ্যে ‘সদ্ভাব’ দেখা গেলেও ভোটের দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে তা পাল্টাপাল্টি ‘আক্রমণে’ রূপ নিতে দেখা গেছে। তাতে জনসভার বক্তব্যগুলো কিছুটা ‘বিতর্ক প্রতিযোগিতা’র আবহে রূপ নিয়েছে।
‘বাক্যবাণের’ প্রচারণার ফল জানতে আর মাত্র কয়েকটি দিনের অপেক্ষা। এরইমধ্যে শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) এ দুই নেতা তাদের ঢাকার বাইরের নির্বাচনী প্রচারণাও শেষ করেছেন। প্রচারণা-জনসভায় আশ্বাস নিয়ে তারা ঘুরেছেন দেশের বিভিন্ন জেলায়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার এ নির্বাচনে এ দুই নেতার নির্বাচনী সফরের রিক্যাপ থাকছে সময়ের পাঠকদের জন্য।
নির্বাচনী প্রচারণা: শুরু ও শেষের সমীকরণ
ঐতিহ্যগতভাবে পুণ্যভূমি সিলেট থেকেই নির্বাচনী প্রচারণার সূচনা করতে দেখা গেছে রাজনৈতিক নেতাদের। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
তারেক রহমান: দীর্ঘ প্রায় ২২ বছর পর সিলেটে পা রেখে ২২ জানুয়ারি ঢাকার বাইরে নিজের আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন বিএনপি চেয়ারম্যান। তিনি হজরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করে সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসা মাঠে বিশাল জনসভার মাধ্যমে প্রচারণা শুরু করেন।
ডা. শফিকুর রহমান: জামায়াত আমির সারা দেশ সফর করে তার ঢাকার বাইরের প্রচারণার সমাপনী টানেন সিলেটে। ৪ ফেব্রুয়ারি তিনি সিলেটে তার জনসভা করেন এবং ৭ ফেব্রুয়ারি তিনি সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ নিউ ফিল্ড মাঠে নির্বাচনী জনসভার মাধ্যমে তিনি এ সফর শেষ করেন। যা বিএনপির সূচনার ঠিক উল্টো এক কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান— প্রচারণা, অঙ্গীকার ও জনসম্পৃক্ততা
তারেক রহমান সিলেট থেকে প্রচারণা কার্যক্রম শুরু করে বৃহত্তর ১৭ জেলাতে সরাসরি জনসভা-সমাবেশে অংশ নেন। অংশ নিয়েছেন রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারি ও ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জেলায়।
তিনি ধানের শীষ প্রতীকের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পুনরুদ্ধার এবং রাজনৈতিক সমর্থন বৃদ্ধির কথা বলেন। জনসভা-সমাবেশগুলোতে সমর্থকদের উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা গেছে। তারেক রহমান বিভিন্ন অঞ্চলে জনসভায় ভোটারদের কাছে বেশ কিছু উন্নয়নমূলক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন
ঠাকুরগাঁও জনসভায় ব্যাপক স্বাস্থ্য রূপান্তর বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তারেক রহমান। যেখানে নতুন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সম্ভাবনা, ডোর-টু-ডোর স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়ার পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। তিনি কৃষি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য ‘ফার্মার কার্ড’ ও ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নীতির কথা বলেছেন।
বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ঠাকুরগাঁওয়ে বিমানবন্দর চালু করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারেক রহমান বলেন, এক যুগ তারা নিজেদের স্বার্থ দেখেছে। ফলে মানুষ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে হেলথ কেয়ারার নিযুক্ত করা হবে। এসব কাজের জন্য ধানের শীষকে ভোট দিতে হবে।
শিক্ষা ও কর্মসংস্থান
একই জনসভায় একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও ক্যাডেট কলেজ খোলার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়, যা উত্তরাঞ্চলের যুবসমাজের জন্য চাকরি ও শিক্ষা সুযোগ বাড়াবে।
একই জনসভায় তিনি তিস্তা নিয়ে কথা বলেন তিনি। অঙ্গীকার করে বলেন,
এই এলাকার মানুষের একটি প্রাণের দাবি আছে তা হলো তিস্তা মহাপরিকল্পনা। ১২ তারিখ বিএনপি ক্ষমতায় গেলে অন্যতম প্রধান কাজ হচ্ছে যত দ্রুত সম্ভব তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। যাতে এই এলাকা এবার সবুজ, শস্য-শ্যামলা হয়ে উঠতে পারে। নীলফামারীতে মেডিকেল কলেজ স্থাপনের দাবি রয়েছে পর্যায়ক্রমে এটিও বাস্তবায়ন করা হবে। কিশোরগঞ্জ সৈয়দপুর শিল্পাঞ্চল, এই এলাকায় রেল কারখানাসহ আরও যেসব শিল্প আছে সেগুলো করে তুলতে চাই।
দুর্নীতি ও নিরাপত্তা
চট্টগ্রাম ও অন্যান্য স্থানে দেয়া বক্তৃতায় তিনি দুর্নীতি শূন্য নীতি এবং ‘আইনের সমান প্রয়োগ’ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। চট্টগ্রামের পোলোগ্রাউন্ডে বিএনপির নির্বাচনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন,
আমরা যতই পরিকল্পনা নিই না কেন, একটি বিষয় যদি আমরা নিয়ন্ত্রণ না করি, তাহলে আমাদের কোনো পরিকল্পনা সফল হবে না। কী সেটি? সেই বিষয়টাও বিএনপি অতীতে প্রমাণ করেছে, একমাত্র বিএনপির পক্ষেই সম্ভব সেই বিষয়টিকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং সেটি হল দুর্নীতি। যেকোনো মূল্যে আগামীতে বিএনপি দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরবে।
নারীদের ভূমিকা
খুলনা জনসভায় তারেক রহমান বলেছিলেন, কেউ নারীদেরকে ঘরের ভেতর আটকে রাখতে চায়, যা ভুল ও অবৈজ্ঞানিক— নারীরা সমাজে সক্রিয় ভূমিকা রাখবেন।
কৃষিবান্ধব প্রকৃতি রক্ষা
জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন,
আমার বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ঢাকা শহরের বাসিন্দারাও এখন খাল খননের প্রয়োজনীয়তা বোধ করছেন৷ কারণ একের পর এক খাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। তাই আগামী নির্বাচনে জনগণের ভোটে বিএনপি সরকার গঠনে সক্ষম হলে সমগ্র বাংলাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটারের খাল খনন করবে।
এছাড়া পাঁচ বছরে ৫০ কোটি গাছ রোপনের পরিকল্পনার কথা বলছে দলটি। এক্ষেত্রে তারা যে এলাকায় যেই গাছ ভালো জন্মায়, সেখানে তারা সেই গাছ রোপন করবে। যেমন, ঢাকার জন্য নিম গাছ।
জনসম্পৃক্ততা
তারেকের সমাবেশগুলোতে স্থানীয় সমর্থক ও সাধারণ ভোটার উভয়ের অংশগ্রহণ লক্ষ্যণীয়। প্রচারণার গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তারেক ঢাকার বাইরের প্রচারণা শুরু করেছিলেন সিলেট থেকে, এরপর উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে সমাবেশ করেছেন— যেমন ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী ও খুলনায় ধারাবাহিক সমাবেশ করেছেন।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান— প্রতিশ্রুতি, আশ্বাস ও জনতা
দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন
নাটোর জনসভায় জামায়াত আমির বলেছিলেন, দুর্নীতি ও লুটপাট বন্ধ করলে দেশ ‘রকেট গতিতে’ এগোবে, এবং সকল দুর্নীতিবাজকে ক্ষমা করা হবে না।
বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার সরকারি আরসি কলেজ মাঠে নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াত আমির বলেন,
ক্ষমতায় গেলে নিজেরা চাঁদাবাজি করব না এবং কাউকে করতেও দেব না। বরং দুর্নীতির ঘাড় ধরে টান দেয়া হবে। আমরা দুর্নীতির পাতা বা ডাল ধরবো না সরাসরি ঘাড় ধরে টান দেব। বড় দুর্নীতিবাজরা আইনের বাইরে থাকবে আর ছোট অপরাধীরা শাস্তি পাবে, এটা হতে দেয়া হবে না।
ন্যায্যতা ও যুব অধিকারে অঙ্গীকার
তিনি সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং যুবসমাজকে দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়তে কাজ করার কথা বলেছেন। বেকারদের সম্মানজনক কাজ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
জামায়াত আমির বলেন,
যুবকদের কাজের উপযোগী করে দক্ষ জনবল না করে কেন বেকার ভাতার গল্প শোনাব? যুবকরা তো আমাদের কাছে বেকার ভাতার দাবি করছে না। এই যুবক-যুবতীদের হাতকে দেশ গড়ার মজবুত কারিগর হিসেবে গড়ে তুলব। হাতে হাতে সম্মানের কাজ তুলে দেব, তারা সেদিন বলবে আমি বাংলাদেশ। আমরা সেই গর্বিত বাংলাদেশ গড়তে চাই, এই দেশ তাদের হাতেই তুলে দিতে চাই।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা
মেডিকেল কলেজ ৬৪ জেলায় স্থাপনের প্রতিশ্রুতি, শিশু ও বয়স্কদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, এবং বিশেষায়িত হাসপাতালের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেছেন।
পঞ্চগড়ের জনসভায় বাংলাদেশের ৬৪ জেলায় মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ড. শফিকুর রহমান বলেন,
চুরি করে যে লক্ষ-কোটি টাকা বিদেশে নিয়ে গেছে, ওগুলো ওদের পেটের ভেতরে হাত ঢুকাইয়া আমরা বের করে আনব ইনশাল্লাহ। আগামীতে কাউকে আর চুরি করতে দেয়া হবে না। আমি বিশ্বাস করি, আজকের জনসভায় শহীদ পরিবারের সদস্যরা রয়েছেন, ২৪ এর জুলাই যোদ্ধা, ৭১ এর বীররা রয়েছেন। আমরা আপনাদের সকলের কাছে ঋণী। আমরা সর্বশক্তি দিয়ে আপনাদের সন্মান করবো। দেশ সেবার সুযোগ পেলে, সরকার গঠনের সুযোগ পেলে, আপনাদের ঋণ পরিশোধ করার চেষ্টা করব ইনশাল্লাহ।
ন্যায় বিচার ও সাম্য
পিরোজপুর সমাবেশে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘দল নির্বাচিত হলে হাদিসহ বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের জন্য বিচার নিশ্চিত করা হবে।’
ভোটপথ রক্ষা ও প্রতিরক্ষা
ঝালকাঠি ও বরিশালের জনসভায় শফিকুর রহমান বলেন, ‘ভোটকেন্দ্র দখল বা অবৈধ কার্যক্রম রোধে একটি গণ-সক্রিয় প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।’
বৃহত্তর অর্থনৈতিক প্রকল্প
রংপুরে তিনি তিস্তার মেগা প্ল্যান বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাবে বলে দাবি করেন।
দেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়াস্থ হেলিপ্যাড মাঠে ১১ দলীয় নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘তিস্তা তো এ অঞ্চলের মানুষের নিয়ামত ও অহংকার হওয়ার কথা ছিল। এখন তিস্তার নাম একসাগর দুঃখ। আমরা কথা দিচ্ছে বিইজনিল্লাহ তিস্তাকে জীবন দিব ইনশাআল্লাহ।’
তিনি আরও বলেন,
এই অঞ্চলের বুড়িমারী স্থলবন্দর আধুনিকায়ন দরকার। এটি আধুনিকায়ন হলে বাংলাদেশই লাভবান হবে। এরপর আছে বুড়িমারী হয়ে লালমনিরহাট হয়ে রংপুর পর্যন্ত চার লেনের রাস্তা। আমি রাস্তা নিয়ে ঘুরেছি। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে এটি রাস্তা না সাগর। শুধু ঢেউ খেলতে থাকে। অসুস্থ রোগীর জান এখানেই কবজ হয়ে যায়। কিন্তু কেন?
উত্তরবঙ্গ কি কারো সৎ মায়ের সন্তান প্রশ্ন রেখে বলেন, একে অবজ্ঞা ও উপেক্ষা করতে হবে। আমরা কথা দিচ্ছি, বঞ্চিত এলাকা থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নের বিসমিল্লাহ হবে।
সীমান্ত সমস্যার স্থায়ী সমাধান এবং সিলেটের চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপেরও অঙ্গীকার করেন জামায়াত আমির।
জনসম্পৃক্ততা
জামায়াতের জনসভায় ধর্মীয় ও যুবসমাজের অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা গেছে এবং নারী ও ছাত্রদের উপস্থিতি বাড়ছে, রাজনৈতিক অঙ্গনে তাদের সক্রিয়তা বেশি হয়েছে বলে শফিকুর উল্লেখ করেছেন।
প্রতিশ্রুতি ও ফোকাস: একটি তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত রূপরেখা
সেক্টর তারেক রহমান (BNP) ডা. শফিকুর রহমান (জামায়াত)
গণতান্ত্রিক কাঠামো একাধিক সভায় গণতান্ত্রিক পুনরুদ্ধার ও রাষ্ট্রীয় অংশগ্রহণের দিক তুলে ধরে। অন্তর্ভুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক সরকারের জন্য নেতিবাচক পুরনো ঐক্যের পরিবর্তে নতুন শুরুর কথা বলেন।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন উন্নয়ন, চাকরি ও ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করার প্রতিশ্রুতি। দুর্নীতি নির্মূল করে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার কথা বলেন।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য তরুণদের সুযোগ–উন্নয়নে জোর দেন। প্রতিটি জেলায় চিকিৎসা কলেজ ও স্বাস্থ্য-সুবিধা প্রসারের প্রতিশ্রুতি দেন।
স্বচ্ছতা ও প্রশাসন নির্বাচনী ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি। প্রার্থীরা সরকারি সুবিধা নেবেন না, ইনকাম-এক্সপেন্স প্রকাশ করবেন।
সহনশীলতা থেকে পাল্টাপাল্টি ট্যাগিং
১. নারীবাদ বনাম রক্ষণশীলতা:
কর্মজীবী নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর ঘোষণা করেছিলেন জামায়াত আমির। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ নানা অঙ্গনে সমালোচনার শিকার হন জামায়াত আমির। ৩০ জানুয়ারি কাতারভিত্তিক সম্প্রচারমাধ্যম আল–জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জামায়াত আমির বলেছেন, জামায়াতে ইসলামীর আমির পদে নারী আসা সম্ভব নয়। এরপরেই আমিরের হ্যাক্ড দাবি করা এক্স হ্যান্ডেল থেকেও কর্মজীবী নারীদের নিয়ে ‘কুরুচিপূর্ণ’ মন্তব্য করা হয়।
আর এসব ঘটনা প্রবাহের প্রেক্ষিতে খুলনার এক জনসভায় (২ ফেব্রুয়ারি) তারেক রহমান অভিযোগ করেন যে, একটি নির্দিষ্ট দল (জামায়াতকে ইঙ্গিত করে) প্রকাশ্যে বলছে তারা নারীর নেতৃত্বে বিশ্বাস করে না। তিনি এটাকে ‘মধ্যযুগীয় মানসিকতা’ বলে ট্যাগ করেন।
তিনি বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দল এই যে বাংলাদেশের অর্ধেক নারী গোষ্ঠীকে তারা কীভাবে ঘরের মধ্যে আটকে রাখতে চায়, সেই কথা তারা বলেছে।’
কারও নাম উল্লেখ না করে জনসভায় তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা দেখেছি, একটি রাজনৈতিক দলের নেতা দুই দিন আগে পরিষ্কারভাবে বলেছেন, যেসব নারী, যেসব মা–বোন কর্মসংস্থানের জন্য যান, আপনাদের সামনে বলতে রীতিমতো লজ্জা হচ্ছে, এমন একটি শব্দ মা–বোনদের জন্য ব্যবহার করেছেন, যা এ দেশের জন্য কলঙ্কস্বরূপ।’
যদিও জামায়াত আমির নানান বক্তব্যে তার অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। এবং জামায়াতের নারীকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ এনে জামায়াত আমির বিএনপির সমালোচনা করেন।
নারীদের হিজাব-বোরকা প্রসঙ্গে এক দলকে ইঙ্গিত করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের মা-বোনদের ইজ্জত রাখতে দেয় না এমন দল কীভাবে হিজাব খুলে ফেলতে বলে! প্রয়োজনে জীবন দেব, তবু মা-বোনদের ইজ্জত কেড়ে নিতে দেয়া হবে না।’
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) সকালে নওগাঁয় ১১ দলীয় ঐক্যের নির্বাচনী জনসভায় জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘গত পাঁচ দিন ধরে ধারাবাহিকভাবে মিসাইল মারা হচ্ছে আমার ওপর। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আইডি হ্যাক করে পরিবারতন্ত্র যারা কায়েম করতে চায় তারা এটা করেছে। এরইমধ্যে অভিযুক্ত ধরা খেয়েছে।’
যারা জনগণের সরকার চায় না, দেশকে গোলাম বানিয়ে রাখতে চায় তারা এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাকের পর মিথ্যাচার করছে বলে অভিযোগ করে ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘যারা এক্স আইডি হ্যাকের পর মিথ্যাচার করছে তাদের ক্ষমা করে দিলাম।’
২. গুপ্ত-সুপ্ত
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৩টায় ফরিদপুর শহরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ মাঠে আয়োজিত বিভাগীয় নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক রহমান বলেছেন, এখনও ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এই ষড়যন্ত্র যারা করছে, তাদেরকে জনগণ একটি নামে ডেকে থাকে। জনগণ তাদেরকে গুপ্ত নামে ডাকে। কারণ, জনগণ দেখেছে, যখনই সময় হয় একদিকে তখন এক রূপ, আবার সময় হয় অন্যদিকে তখন আরেক রূপ। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তারা রূপের পরিবর্তন করে। এরা যে শুধু রূপের পরিবর্তন করে তা না, এরা জনগণকে অপমানিত করে। জনগণের প্রতি তাদের এখনও মোটেও আস্থা নেই।
এদিকে শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ১০টায় হবিগঞ্জের নিউ ফিল্ড মাঠে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোট আয়োজিত নির্বাচনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শফিকুর রহমান বলেন, ‘দেশে ঝামেলা হলেই কেউ কেউ দেশ ছেড়ে চলে যান, কিন্তু আমরা কোথাও যাইনি, ভবিষ্যতেও যাব না, ইনশাআল্লাহ।’
ভোটার মনোভাব ও জনমত- সার্বিক বিশ্লেষণ
বিএনপি ও জামায়াতের সমর্থন: কোন দলের মাত্রা কোথায়?
সাম্প্রতিক একটি জাতীয় জরিপে দেখা গেছে বিএনপি ও তার সহযোগী দলের প্রতি মোটামুটি ৫২.৮% ভোটারই সমর্থন জানাচ্ছে, যেখানে জামায়াতে ইসলামী ও তার জোট প্রার্থী মাত্র ৩১%-এর কাছাকাছি পছন্দ পেয়েছে। জরিপে ৪৭.৬% মানুষ মনে করেন তারেক রহমানই পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন।
অন্য একটি ২১ নভেম্বর থেকে ২০ ডিসেম্বরের জরিপে দেখায় বিএনপি-এর ভোটার সমর্থন ৩৪.৭% ও জামায়াত ৩৩.৬% পেয়েছে; এই জরিপে ভোট undecided মানুষের সংখ্যা বেশি থাকায় ফল আরও টাইট ছিল।
যদিও পৃথক জরিপে বিএনপি-এর সমর্থন অনেক বেশি (প্রায় ৭০%) প্রদর্শিত হয়েছে, সেখানে জামায়াতকে মাত্র ১৯% সমর্থন পেয়েছে— এটিও একটি আলাদা গবেষণার ফল।
ভোটার সিদ্ধান্তে কোন ইস্যু প্রবল প্রভাব ফেলছে?
জরিপ বিশ্লেষণে দেখা গেছে বেশিরভাগ ভোটার দুর্নীতি নির্মূলকে (৬৭.৩%) তাদের ভোটের সিদ্ধান্তে প্রধান ফ্যাকটর বলেছে, এবং উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, সুরক্ষা ইত্যাদি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এছাড়া ভোটার মত অনুযায়ী পার্টি বা নেতা-ক্যান্ডিডেটের গুরুত্ব প্রায় সমান (৩০% পার্টি এবং ৩০% ব্যক্তি)।
ভোটাররা শুধুমাত্র ঐতিহাসিক দলের প্রতি আনুগত্যের ওপর নির্ভর করছেন না; বরং তারা করুণ নীতি, বাস্তব উন্নয়ন, ও জীবনমানের উন্নতিকে এগিয়ে রাখছেন। একটি পৃথক সার্ভেতে বলা হয়েছে প্রায় ৯৩.৩% ভোটারই আশা করছেন তারা ভোট দেবেন, এবং প্রায় ৭২.৩% মনে করেন নির্বাচন মুক্ত ও ন্যায্যভাবে হবে।
এছাড়া পুরোনো জরিপেও দেখা গেছে প্রায় ৭৭.৫% ভোটার মনে করেন তারা নিরাপদে ভোট দিতে পারবেন, যদিও কিছু শহর ও শিক্ষিত শ্রেণি-সমাজ এই বিষয়ে একটু বেশি সংশয় উল্লিখিত করেছে।