
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের মার্কিন একচ্ছত্র আধিপত্যের সমীকরণ বদলে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক স্বার্থ আর নিরাপত্তা ভাগ হয়ে যাচ্ছে বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর মধ্যে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বলয় থেকে বেরিয়ে এখন চীনের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের দিকে ঝুঁকছে এ অঞ্চলের দেশগুলো। এমন পরিস্থিতিতে চিরবৈরী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও তৈরি হচ্ছে সরাসরি যোগাযোগের এক নতুন আঞ্চলিক কূটনীতি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ছড়ি ঘুরিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক শক্তিই ছিল এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও জ্বালানি বাণিজ্যের প্রধান গ্যারান্টার। তবে সেই পুরনো সমীকরণ এখন ভাঙতে শুরু করেছে।
ওয়াশিংটন এখন কেবলই সামরিক শক্তির জোরে প্রভাব ধরে রাখছে, আর অন্যপাশে বাণিজ্য ও অবকাঠামোগত কূটনীতি দিয়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে চলেছে এশিয়ার পরাশক্তি চীন.
পরিসংখ্যান বলছে, গত দুই দশকে চীন ও আরব বিশ্বের মধ্যকার বাণিজ্য ৩৬ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বেইজিং এখন মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন এখনো ১৯টি ঘাঁটিতে সেনা মোতায়েন রেখে এবং বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করে নিরাপত্তা দিলেও, এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবে তার আগের অবস্থান হারিয়েছে।
ইরান যুদ্ধ এই বিপরীতমুখী অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। হরমুজ প্রণালীতে যখন সংঘাত চরম রূপ নেয়, তখন চীনের জ্বালানি সরবরাহ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছিল। কিন্তু অনেকের মতে, পরিস্থিতি সামাল দেয়ার মতো সামরিক সক্ষমতা চীনের ছিল না।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রশাসন তাদের নৌবাহিনী দিয়ে পথ সচল রাখার দাবি করলেও তার সরাসরি অর্থনৈতিক সুবিধাভোগী ছিল মূলত ইরানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ এশিয়ার দেশগুলো।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক নির্ভরতা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই মেরুতে চলে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। ওয়াশিংটনের ওপর থেকে পুরোপুরি ভরসা তুলে নিতে না পারলেও, তার নীতি ও প্রতিশ্রুতিকে এখন আর শতভাগ নির্ভরযোগ্য মনে করছে না তারা। ফলে সৌদি আরব, ইরান কিংবা তুরস্ক এখন মার্কিন মধ্যস্থতা ছাড়াই নিজেদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করছে।
এই নতুন বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্যে শীতল যুদ্ধকালীন ‘হেলসিঙ্কি চুক্তি’র আদলে একটি আঞ্চলিক অনাক্রমণ চুক্তি বা ‘নন-অ্যাগ্রেশন প্যাক’-এর প্রস্তাব আলোচনায় এসেছে। তবে দেশগুলোর দীর্ঘদিনের পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং প্রক্সি যুদ্ধ বন্ধের নিশ্চয়তা না থাকায় এই উদ্যোগের স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয় কাটছে না।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্ধশতাব্দী পর মধ্যপ্রাচ্যের নেতারা এখন নিজেদের ভাগ্য নিজেরা নির্ধারণের এক কঠিন মোড়ে দাঁড়িয়ে।