
এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ‘স্পেস এলিভেটর’ বা মহাকাশের লিফট কেবল বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর পাতায় কিংবা হলিউডের সিনেমাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। রকেটের তীব্র গর্জন, বিপুল জ্বালানি খরচ ও মহাকাশে বর্জ্য সৃষ্টি না করেই পৃথিবী থেকে সরাসরি মহাকাশে কার্গো এবং মানুষ পৌঁছে দেওয়ার এই ধারণাটিকে এতদিন অসম্ভব মনে করা হতো। তবে বর্তমান যুগের বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের দাবি- এটি আর কোনো কাল্পনিক রূপকথা নয়। এখন প্রশ্ন এটা নয় যে আমরা এটি তৈরি করতে পারব কি না, বরং প্রশ্ন হলো- আমরা কেন এটি তৈরির চেষ্টাই করছি না?
আধুনিক বিজ্ঞানীদের ভাবনায় মহাকাশ লিফটের নকশাটি অত্যন্ত চমৎকার ও বিশাল। পৃথিবীর বিষুবরেখার কাছাকাছি কোনো অঞ্চল থেকে মহাকাশের দিকে প্রায় ১ লাখ কিলোমিটার লম্বা একটি অতি-শক্তিশালী তার বা ‘টেদার’ প্রসারিত করা হবে, যা ভূ-স্থির কক্ষপথে নিজের ভারসাম্য বজায় রাখবে। এরপর বিদ্যুৎ চালিত বিশেষ ক্লাইম্বার বা লিফটের মাধ্যমে এই তার বেয়ে উপগ্রহ, রকেট ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম খুব সহজেই মহাকাশে পাঠানো সম্ভব হবে। বিগত দুই দশকের একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রাফিন-ভিত্তিক উপাদানের অভাবনীয় উন্নতির ফলে এই প্রযুক্তি এখন প্রকৌশলগত বাস্তবতার খুব কাছাকাছি।
তাহলে প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও কোনো দেশ বা আন্তর্জাতিক সংস্থা কেন এটি তৈরিতে এগিয়ে আসছে না? অর্থনীতিবিদদের মতে, এর মূল বাধা প্রযুক্তিগত নয়, বরং অর্থনৈতিক।
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, একটি মহাকাশ লিফট তৈরি করতে ১৫ বিলিয়ন থেকে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে এই অঙ্ক বিশাল মনে হলেও, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (আইএসএস) তৈরিতে খরচ হয়েছিল প্রায় ১৫০ বিলিয়ন ডলার। আর কেবল ২০২৫ সালেই বিশ্বজুড়ে সামরিক খাতেই ব্যয় হয়েছে ২ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। অর্থাৎ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আর্থিক সুবিধা থাকলে মানবজাতি এর চেয়েও বড় প্রকল্পে অর্থায়ন করতে পারে।
আসল সমস্যাটি লুকিয়ে আছে আমাদের প্রচলিত অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনায়। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থা কেবল সেই প্রকল্পেই বিনিয়োগ করতে পছন্দ করে, যা খুব দ্রুত এবং নিশ্চিত মুনাফা এনে দেয়। মহাকাশ লিফটের মতো একটি মেগা-প্রকল্প তৈরি করতে কয়েক দশক সময় লেগে যেতে পারে, যার সুবিধা ভোগ করবে মূলত আগামী প্রজন্ম। সস্তায় মহাকাশ ভ্রমণ, কক্ষপথে উৎপাদন শিল্প গড়ে তোলা বা সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো বৈপ্লবিক সুবিধাগুলো দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এই ঝুঁকি নিতে চান না।
মহাকাশ লিফট কোনো বাণিজ্যিক পণ্য নয়, এটি আসলে একটি ‘পাবলিক ইউটিলিটি’ বা জনকল্যাণমূলক অবকাঠামো, ঠিক যেমন আমাদের মহাসড়ক বা সমুদ্রবন্দর। এর সুবিধা শুধু ব্যবহারকারীরাই নয়, গোটা সমাজ পাবে। যেমনটি অতীতে রেললাইন, ইন্টারনেট বা জিপিএস প্রযুক্তির ক্ষেত্রে হয়েছিল— যেখানে শুরুতে সরকারি ও বড় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ছাড়া এগুলো সম্ভব হতো না।
রকেটের মাধ্যমে মহাকাশে প্রতিবার যাতায়াত করতে যেখানে বিপুল শক্তি ও কোটি কোটি ডলারের সম্পদ ধ্বংস হয়, সেখানে এই লিফট পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ শক্তির মাধ্যমে মহাকাশ অর্থনীতিকে চিরতরে বদলে দিতে পারে। ইতিহাস সাক্ষী, রেললাইন বা উড়োজাহাজের শুরুর দিকেও মানুষ একে অসম্ভব বলে উপহাস করেছিল। এমনকি অতি সম্প্রতি স্পেসএক্সের পুনরায় ব্যবহারযোগ্য রকেটের ধারণাকেও অনেকে বিশ্বাস করতে চাননি, যা আজ ইতিহাসের অন্যতম সফল বাণিজ্যিক মডেলে পরিণত হয়েছে।
মহাকাশ লিফট হয়তো একদিন মানবতার ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবকাঠামো হয়ে উঠবে, নয়তো এটি ব্যর্থ হবে। তবে বিজ্ঞানীদের মতে, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের অভাব নয়; বরং চ্যালেঞ্জটি হলো আমাদের সংকীর্ণ অর্থনৈতিক মানসিকতা, যা ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ বা তাৎক্ষণিক মুনাফার জন্য মুহূর্তেই কোটি কোটি ডলার বরাদ্দ করতে পারে, কিন্তু মানবসভ্যতার দূরদর্শী অগ্রগতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে দ্বিধাবোধ করে।সূত্র : গালফ নিউজ