
আসছে বাজেট বাস্তবায়নে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হতে পারে। অথচ চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে সংস্থাটি আদায় করতে পেরেছে মাত্র ২ লাখ ৮৭ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। একদিকে ব্যবসা সহজীকরণের প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে উচ্চ রাজস্ব আদায়ের চাপ; এতে বিনিয়োগ কতটা স্বস্তিতে থাকবে, তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন উদ্যোক্তারা। তাদের দাবি, বিনিয়োগবান্ধব কর কাঠামো ও রাজস্ব আদায়ে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।
১৯৯১ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে ভ্যাট ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ে যে বড় পরিবর্তনের সূচনা করেছিল বিএনপি সরকার, এনবিআরের তথ্য বলছে, ধীরে ধীরে সেই ভ্যাটই সরকারের বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় অর্থের উৎসে পরিণত হয়েছে।
ভ্যাট থেকেই চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে এনবিআর। সংস্থাটির সংশোধিত মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। সেই লক্ষ্য পূরণে জুন পর্যন্ত বাকি তিন মাসে আরও প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এমন বাস্তবতার মধ্যেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হতে পারে, যা জিডিপির ১০ দশমিক ১৭ শতাংশ। এর মধ্যে এনবিআরের ওপরই পড়তে পারে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের দায়িত্ব। উদ্যোক্তারা বলছেন, বড় অঙ্কের এই রাজস্ব আদায়ের চাপ যেন হয়রানিতে পরিণত না হয়, সেই নিশ্চয়তা প্রয়োজন।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, ‘সাবকন্ট্রাক্টে মূল ফ্যাক্টরি একবার উৎসে কর দিচ্ছে, আবার যিনি কাজ করছেন এবং যিনি কাজ দিচ্ছেন, সেখানেও কর দিতে হচ্ছে। এটা ডাবল ট্যাক্সেশন, যা হওয়া উচিত নয়। সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে, এটা আমরা জানি। তবে শুধু ফিসকাল সাপোর্ট নয়, আমাদের পলিসি সাপোর্টও দিতে হবে। এমন নীতিগত সহায়তা দরকার, যাতে সরকারের রাজস্বে নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, কিন্তু ব্যবসা করা সহজ হয়। ব্যবসা সহজ হলে খরচও কমবে।’
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকার যদি বিনিয়োগবান্ধব কর কাঠামো তৈরি করে, তাহলে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজস্ব দিতে আগ্রহী হবেন। তবে কর ব্যবস্থায় সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘সরকার বলছে রিবেট দিয়েছে, আবার আইএমএ বলছে রিবেট দেয়া যাবে না। যেখানে স্বাভাবিকভাবে করহার ২০ থেকে ২৫ শতাংশ হওয়ার কথা, সেখানে আমাদের কাছ থেকে ৫২ শতাংশ পর্যন্ত কর নেয়া হচ্ছে। এই অন্যায্য কর ব্যবস্থার কারণে ব্যবসায়ীরা লাভ দেখাতে বা কর দিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। অত্যাচার বন্ধ হলে সরকারের রাজস্বও স্বাভাবিকভাবে বাড়বে।’
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এনবিআরের কাঠামোগত সংস্কার ও সক্ষমতা না বাড়িয়ে শুধু করের চাপ বাড়ালে বিনিয়োগ কমে যেতে পারে। এতে রাজস্ব আদায়ও আরও চাপে পড়বে। পিআরআইর চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তার বলেন, ‘রাজস্ব আহরণ অবশ্যই করতে হবে, তবে সেটা একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার মাধ্যমে। আজ এটা বাড়ালাম, কাল আরেকটা কর বাড়ালাম; এভাবে রাজস্ব আদায় করা যায় না। এমন কর ব্যবস্থা দরকার, যেখানে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর দেবে। আমাদের দেশে সেই স্বেচ্ছা কর প্রদানের সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। এজন্য ট্যাক্স সিস্টেমকে আরও ভালো করতে হবে।’
তথ্য বলছে, এনবিআর বহির্ভূত ও নন-ট্যাক্স রেভিনিউ মিলিয়ে আরও ৯১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে চায় সরকার। এরপরও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি থাকতে পারে।