
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে একসময় প্রচারের আলো প্রায় পুরোটা নিয়ে যেতেন টলিপাড়ার ব্যস্ততম অভিনেতা-অভিনেত্রীরা। মঞ্চে তারকা, রোড শো-তে ভিড়, প্রচারে রূপালি পর্দার পরিচিত মুখ—বাংলার ভোটে এ ছিল খুব চেনা ছবি। কিন্তু এবারের দ্বিতীয় দফার ভোটে সেই চেনা ছবির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি নতুন মাত্রা। চলচ্চিত্র জগতের পাশাপাশি এবার নজর কাড়ছেন সংবাদমাধ্যম থেকে রাজনীতির ময়দানে আসা প্রার্থীরাও।
২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফায় ১৪২টি আসনে ভোট। এই দফায় শুধু রাজনৈতিক হেভিওয়েট নন, অভিনেতা-অভিনেত্রী, চলচ্চিত্র নির্মাতা, সাংবাদিক, নারী প্রার্থী এবং মুসলিম প্রার্থীর সংখ্যাও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
এবারের প্রার্থী বাছাইয়ে বিভিন্ন দল পেশাগত পরিচয় ও সামাজিক প্রতিনিধিত্ব—দুটোকেই গুরুত্ব দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তৃণমূলের তালিকায় দ্বিতীয় দফার ভোটে লড়ছেন টলিপাড়ার একাধিক পরিচিত মুখ রয়েছেন। যেমন: নদিয়ার করিমপুর আসন থেকে লড়ছেন অভিনেতা সোহম চক্রবর্তী। বরানগরে তৃণমূলের প্রার্থী অভিনেত্রী সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। দমদমে লড়ছেন নাট্যকার, অভিনেতা ও পরিচালক ব্রাত্য বসু। কলকাতার চৌরঙ্গী আসনে তৃণমূল প্রার্থী করেছে অভিনেত্রী নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়কে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুর দক্ষিণে লড়ছেন লাভলি মৈত্র। ব্যারাকপুরে রয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাতা রাজ চক্রবর্তী।
তবে এবারের ভোটে শুধু প্রার্থী হিসেবেই নয়, প্রচারেও তারকারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছেন। তৃণমূলের হয়ে শেষ দফার প্রচারে দেখা যাচ্ছে সদ্য নির্বাচিত রাজ্যসভার সাংসদ ও অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিককে। কোয়েল জামুড়িয়ায় তৃণমূল প্রার্থীর সমর্থনে রোড শো করেছেন। তৃণমূলের তারকা প্রচারকের তালিকাতেও কোয়েল মল্লিক, দেব, রাজ চক্রবর্তী, সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, জুন মালিয়া, সায়নী ঘোষ, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, শতাব্দী রায়, শত্রুঘ্ন সিনহা, বাবুল সুপ্রিয়দের নাম রয়েছে। এদের মধ্যে কয়েকজন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করছেন।
রাজনৈতিক মহলের মতে, তৃণমূলের কৌশল স্পষ্ট; যেখানে প্রয়োজন, সেখানে প্রার্থী হিসেবে তারকা, আবার প্রয়োজন পড়লে প্রচারমঞ্চেও তারকা। তবে আগের মতো শুধুই তারকা-ঝলক দিয়ে ভোট টানার কৌশল এবার ততটা সরল নয়। কারণ ভোটারদের একাংশ এখন জানতে চাইছেন, তারকা জিতলে এলাকায় থাকবেন কি না, মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখবেন কি না, এবার সেটাও বিবেচনা করা হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই।
তৃণমূলের তুলনায় সংখ্যায় কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও বিজেপির তারকা তালিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। গেরুয়া শিবিরের হয়ে সোনারপুর দক্ষিণ থেকে লড়ছেন রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। টালিগঞ্জে বিজেপির প্রার্থী অভিনেত্রী পাপিয়া অধিকারী। শিবপুরে আছেন অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষ। আর শ্যামপুর আসনে প্রার্থী হয়েছেন অভিনেতা হিরণ চট্টোপাধ্যায়।
প্রচারের ময়দানেও বিজেপি তারকা-শক্তি ব্যবহার করছে। বিজেপির হয়ে প্রচারে সবচেয়ে বড় মুখ মিঠুন চক্রবর্তী। উলুবেড়িয়া উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থীর সমর্থনে মিঠুন প্রচার করেছেন। বিজেপির তারকা প্রচারকের তালিকায় মিঠুন চক্রবর্তীর পাশাপাশি হেমা মালিনী, কঙ্গনা রনৌত, স্মৃতি ইরানি, মনোজ তিওয়ারি, লিয়েন্ডার পেজের নামও রয়েছে।
তবে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভোটে সাংবাদিক প্রার্থী করার দিক থেকেও এবারের ভোট আলাদা করে নজর কাড়ছে। তৃণমূলের হয়ে খড়দহ থেকে লড়ছেন দেবদীপ পুরোহিত, যিনি বাংলাদেশেও ব্যাপকভাবে পরিচিত মুখ। কলকাতার বেলেঘাটায় প্রার্থী হয়েছেন লেখক, অভিনেতা ও সাংবাদিক কুণাল ঘোষ।
অন্যদিকে বিজেপির হয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে রয়েছেন জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়, মানব গুহ এবং সন্তু পান। ফলে দ্বিতীয় দফার আগে বাংলার ভোটে শুধু চলচ্চিত্র জগত নয়, সংবাদমাধ্যমের মুখও রাজনৈতিক আলোচনায় উঠে এসেছে।
এই প্রসঙ্গে সংবাদ প্রতিদিনের ডেপুটি নিউজ এডিটর শীর্ষেন্দু চক্রবর্তীর বক্তব্য, আগের তুলনায় এখন সেলিব্রিটি প্রার্থীদের নিয়ে তেমন কথা শোনা যাচ্ছে না। কারণ, অনেক তারকা প্রার্থীর বিরুদ্ধেই ভোটে জেতার পর এলাকায় না যাওয়া, সেলিব্রিটি ভাব দেখানো এবং নিয়মিত জনসংযোগ না রাখার অভিযোগ উঠেছে। এই সাংবাদিকের মতে, এই কারণেই দলের শীর্ষ নেতৃত্ব আগের তুলনায় সেলিব্রিটিদের প্রার্থী করার ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্ক হয়েছে। তিনি মনে করেন, তারকাদের চেয়ে সাংবাদিকদের প্রার্থী করায় রাজনৈতিক দল গুলোর গ্রহণযোগ্যতা আরো বাড়বে।
অন্যদিকে চলচ্চিত্র নির্মাতা ও রাজনৈতিক গবেষক সৌমিত্র দস্তিদার সাংবাদিকদের প্রার্থী করা নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী নন। তার বক্তব্য, এখন আর সেই গণমাধ্যম নেই, যারা সত্যিকারের অর্থে জনগণের হয়ে কথা বলবে, সত্যিকে সত্যি আর মিথ্যেকে মিথ্যে বলবে। তিনি মনে করে, গণমাধ্যমের বড় অংশই কর্পোরেট প্রভাব ও রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। তাই সংবাদমাধ্যম থেকে কেউ প্রার্থী হলেই রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে–এমনটা তিনি মনে করেন না।
আগামী ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফার ভোটে আরেকটি বড় আলোচনার জায়গা নারী ও মুসলিম প্রার্থীদের সংখ্যাও। এই দফার ১৪২ আসনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রায় ২১৮ জন নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। একই সঙ্গে মুসলিম প্রার্থীর সংখ্যা প্রায় ৬৭ জন।
জানা যাচ্ছে, নারী প্রার্থী দেওয়ার ক্ষেত্রে তৃণমূল এগিয়ে থাকলেও মুসলিম প্রার্থী দেওয়ার অঙ্কে কংগ্রেস তুলনামূলকভাবে বেশি আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছে। বাম শিবিরও মুসলিম প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে নিজস্ব জায়গা ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। বিজেপির ক্ষেত্রে মুসলিম প্রার্থীর উপস্থিতি কার্যত নেই। ফলে বিষয়টি নিয়ে নেতিবাচক আলোচনাও রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দ্বিতীয় দফার ভোট শুধু আসন দখলের লড়াই নয়। এই দফা দেখিয়ে দেবে, বাংলার ভোটে তারকা-পরিচিতি কতটা কার্যকর, সাংবাদিক প্রার্থীরা কতটা গ্রহণযোগ্য। আর নারী প্রতিনিধিত্ব কতটা বাস্তব শক্তিতে রূপ নেন। আর মুসলিম প্রার্থীর অঙ্ক শেষ পর্যন্ত কোন দলের ভোট-সমীকরণ বদলে দিতে পারে। সময়