News update
  • 13 years of Rana Plaza tragedy: Workers want justice, pay tribute     |     
  • Minister Mahbub visits July Uprising injured on treatment in Thailand     |     
  • Iran FM Araghchi heads to Islamabad for US talks resumption     |     
  • Coast Guard seizes illegal fuel, adulterated edible oil in Bhola     |     
  • Barapukuria power plant resumes generation after 2-day shutdown     |     

এক হাতে ইফতার, অন্য হাতের ইশারায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ

গ্রীণওয়াচ ডেস্ক বিবিধ 2026-02-21, 5:58pm

img_20260221_175806-46bae6b4c2b74073852d042260c263111771675099.jpg




রমজানের বিকেল নামলেই রাজধানীর বাতাসে অন্য রকম তাড়া। অফিস ছুটি, স্কুল ফেরা, বাজারের ব্যাগ- সব মিলিয়ে শহর যেন একসঙ্গে ছুটতে শুরু করে। এই ছুটে চলার মাঝখানে কেউ ঘরে ফিরছে ইফতারের টেবিলে বসার আশায়, কেউ আবার থেমে আছে সড়কের মোড়ে- যেন সেই ফেরা নির্বিঘ্ন হয়। ঢাকার ব্যস্ত সিগন্যালগুলোতে প্রতিদিন রোজার এই সময়টায় দায়িত্বে থাকেন ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা। তাদের অনেকের ইফতারও হয় সড়কেই।

বিজয় সরণি, সোনারগাঁও, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার- রমজান এলেই এসব সিগন্যালের দৃশ্য বদলে যায়। দিনের শেষ আলোয় গাড়ির গতি কিছুটা ধীর হলেও তাড়াহুড়ার মাত্রা কমে না। সিগন্যালের পাশে থাকা ছোট্ট ট্রাফিক বক্সগুলো তখন হয়ে ওঠে ইফতারের প্রস্তুতির জায়গা। কোথাও প্লাস্টিকের পাত্রে ছোলা-মুড়ি, কোথাও খেজুর আর পানি। আবার কোথাও ভ্রাম্যমাণ দোকান থেকে কেনা সামান্য ইফতারি। সবই দ্রুত, সবই সাদামাটা।

ট্রাফিক পুলিশের দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে রোজার এই বাস্তবতা যেন আলাদা করে মিশে গেছে। সকাল ও বিকেল দুই পালায় ভাগ করা দায়িত্বের মধ্যে বিকেলের পালাটাই সবচেয়ে কঠিন। ইফতারের আগের সময়টায় সড়কে চাপ বাড়ে, মনেও থাকে সময়ের হিসাব। অথচ সংকেতের দিকে চোখ রাখতে হয় একটানা। এক হাতে বাঁশি, অন্য হাতে ইফতারির প্যাকেট এমন দৃশ্য রমজানে ঢাকার সড়কে নতুন কিছু নয়।

এই বাস্তবতার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা। কেউ কেউ দল বেঁধে ট্রাফিক বক্সে ইফতার করেন, আবার কেউ দাঁড়িয়েই সড়কের পাশে। ছুটির দিনে চাপ কিছুটা কম হলে একসঙ্গে বসার সুযোগ মেলে। কিন্তু কর্মদিবসে সেই সুযোগ খুবই সীমিত। তবু দায়িত্বের ছন্দ ভাঙে না। সিগন্যালের লাল-সবুজ বাতির মতোই তাদের দিন চলে নির্দিষ্ট নিয়মে।

রমজানজুড়ে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সিগন্যালগুলোতে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব থাকে। এক দিন পরপর বিকেলের পালা পড়ায় অনেককেই নিয়মিত সড়কে ইফতার করতে হয়। এ সময় তাদের জন্য নির্দিষ্ট ইফতারি সরবরাহের ব্যবস্থা থাকে। খাবারের প্যাকেট ইফতারের আগেই পৌঁছে দেওয়া হয়, যেন দায়িত্বের ফাঁকে অন্তত ন্যূনতম খাবার জোটে। পাশাপাশি কেউ কেউ নিজের পছন্দের কিছু খাবার যোগ করে নেন সামান্য স্বাদ বদলের জন্যই হোক বা একসঙ্গে খাওয়ার আনন্দের জন্য।

সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে ইফতার করার অভ্যাস সহজ নয়। রোদ, ধুলো, গাড়ির হর্ন সব মিলিয়ে পরিবেশটা পরিবারিক ইফতারের মতো শান্ত নয়। তবু বছরের পর বছর এইভাবেই রোজা কাটে তাদের। ধীরে ধীরে সেটাই হয়ে ওঠে জীবনের অংশ। রোজার দিনগুলোতে তারা যেন শহরের নীরব পাহারাদার নিজেদের ইফতারের সময়টুকু বিসর্জন দিয়ে অন্যদের সময়মতো ঘরে ফেরার পথ পরিষ্কার রাখেন।

এ বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের ইফতারের জন্য একটা বিশেষ বরাদ্দ থাকে। সেই বরাদ্দ থেকেই ইফতার সরবরাহ করা হয়। বিকেলের পালায় রাজধানীতে প্রায় ২ হাজার ৩০০ ট্রাফিক সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। এর বাইরে আরও ৫০০ ট্রাফিক সহায়তাকারী থাকেন। ইফতারের আগেই তাঁদের কাছে খাবারের প্যাকেট পৌঁছে দেওয়া হয়।

বিজয় সরণি সিগন্যাল থেকে ফার্মগেট সড়কের পাশেই কলমিলতা কাঁচাবাজার। সেখানে গিয়ে দেখা গেল, ভ্রাম্যমাণ দোকান থেকে ইফতারি কিনছেন পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মো. শামীম মন্ডল। সঙ্গে রয়েছেন আরও দুজন ট্রাফিক পুলিশ সদস্য। তিনি জানান, পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের ইফতারির প্যাকেট দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তারা আরও কিছু পছন্দের খাবার কিনছেন। সেগুলো দিয়ে রাস্তায়ই সবাই মিলে ইফতার করবেন।

পরিবার ছাড়া ইফতার করতে কষ্ট লাগে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রথম প্রথম খারাপ লাগত। এখন আর কিছু মনে হয় না। অভ্যাস হয়ে গেছে। পরিবার ছেড়ে ইফতার করতে করতে পাথর হয়ে গেছি।

ঢাকার প্রতিটি সিগন্যালে এই দৃশ্য আলাদা হলেও মূল গল্প একই। ইফতারের ঠিক আগমুহূর্তে শহরের মানুষ যখন শেষ চেষ্টা করে ঘরে ফেরার, তখন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের চোখ থাকে যান চলাচলের দিকে। কেউ যেন ভুল পথে না ঢোকে, কেউ যেন সিগন্যাল ভাঙে না এই দায়িত্ব পালনেই কেটে যায় আযানের সময়টুকু। অনেক সময় ইফতারের প্রথম লোকমাটাও মুখে ওঠে দেরিতে।

এই চিত্র শুধু কয়েকটি সিগন্যালে সীমাবদ্ধ নয়। পুরো রাজধানীজুড়েই প্রতিদিন বিকেলে কয়েক হাজার ট্রাফিক পুলিশ সদস্য সড়কে থাকেন। তাদের সঙ্গে থাকেন ট্রাফিক সহায়তাকারীরাও। সবাই মিলে শহরের গতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখেন, যাতে রোজার সন্ধ্যায় বিশৃঙ্খলা না বাড়ে। এই সমন্বিত প্রয়াসের ফলেই বহু মানুষ সময়মতো পরিবারের সঙ্গে বসতে পারেন ইফতারের টেবিলে।

ট্রাফিক পুলিশের এই রুটিনের পেছনে আছে দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা। নতুন সদস্যদের জন্য প্রথম দিকের রোজাগুলো কঠিন হলেও ধীরে ধীরে মানিয়ে নিতে হয়। সড়কে দাঁড়িয়ে ইফতার করা, দ্রুত খাবার শেষ করে আবার কাজে ফেরা এই চক্রটাই রোজার পরিচিত ছক হয়ে ওঠে। পরিবারে না থেকেও দায়িত্বের কারণে তাদের মন পড়ে থাকে শহরের প্রতিটি যাত্রীর ঘরে ফেরার আশায়।

এই বাস্তবতায় রমজান যেন তাদের কাছে শুধু সংযমের মাস নয়, দায়িত্বেরও মাস। দিনের পর দিন একই নিয়মে কাজ করতে করতে ব্যক্তিগত অনুভূতিগুলো অনেক সময় আড়ালে চলে যায়। তবু প্রতিটি ইফতারির প্যাকেট, প্রতিটি ছোট বিরতি তাদের কর্মজীবনের নীরব সাক্ষ্য বহন করে।

ঢাকা মহানগর পুলিশ এর ট্রাফিক বিভাগের আওতায় প্রতিদিন হাজারো সদস্য এই দায়িত্ব পালন করেন। রমজান এলেই তাদের কাজের ধরন বদলায় না, শুধু সময়ের চাপটা একটু বাড়ে। শহরের মানুষের স্বস্তির জন্য সেই চাপটাই তাঁরা নেন নিজেদের কাঁধে।

সন্ধ্যার আকাশে আযানের ধ্বনি ভেসে এলে ঢাকার অনেক ঘরে শুরু হয় ইফতার। আর ঠিক তখনই কোথাও না কোথাও সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে কেউ একজন দ্রুত খেজুর মুখে দিয়ে আবার হাত তুলছেন গাড়িকে থামার সংকেত দিতে। নগরজীবনের এই দৃশ্য চোখে না পড়লেও প্রতিদিনই ঘটে। রমজানের প্রতিটি সন্ধ্যায়, প্রতিটি সিগন্যালে।