
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বাংলাদেশের নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। প্রতি মাসে বাংলাদেশমুখী প্রোডাক্ট অয়েল, ক্রুড অয়েল, এলপিজি ও এলএনজিবাহী অন্তত ১৫টি জাহাজ এই প্রণালি অতিক্রম করে দেশে আসে। তাই বিশেষজ্ঞরা বিকল্প উৎস ও নতুন রুট থেকে জ্বালানি সংগ্রহ এবং মজুত বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর ইরানও আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েতসহ কয়েকটি দেশে পাল্টা হামলা চালায়। এর প্রভাব পড়ে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে। এই পথ দিয়েই বিশ্বে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের ২০ শতাংশের বেশি পরিবহন করা হয়।
এই নৌপথ দিয়ে প্রতি মাসে তিন হাজারের বেশি জ্বালানিবাহী জাহাজ ও ট্যাংকার চলাচল করে। একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশে আসে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও জেট অয়েলবাহী ৭ থেকে ৮টি জাহাজ, ২টি ক্রুড অয়েলবাহী মাদার ট্যাংকার, ২ থেকে ৩টি এলপিজিবাহী জাহাজ এবং আরও ৩টি এলএনজিবাহী বিশেষ জাহাজ।
চট্টগ্রাম নৌ বাণিজ্য অধিদফতরের প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন সাব্বির মাহমুদ বলেন, তেল ও গ্যাসসংক্রান্ত কার্গোর সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিলম্ব ও ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যগামী বা সেখান থেকে আসা কনটেইনার পরিবহনও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
অবশ্য কনটেইনারবাহী মাদার ভেসেলগুলো বিকল্প রুট ব্যবহার শুরু করলেও ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরগুলোতে জট বাড়ায় ভোগান্তি বাড়ছে। বিশেষ করে সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কার কলম্বো, মালয়েশিয়ার পোর্ট কেলাং ও তাঞ্জুম পালাপাস বন্দরে কনটেইনার ও জাহাজের জট তৈরি হচ্ছে।
এমএসসি শিপিংয়ের হেড অব অপারেশন আজমীর হোসাইন চৌধুরী জানান, বন্দরে জট বাড়লে জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড সময় বেড়ে যাবে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন খরচও বাড়বে।
নিরাপত্তার কারণে জাহাজগুলো বিকল্প পথ খুঁজলেও এতে সময় দ্বিগুণের বেশি লাগতে পারে এবং খরচ বাড়তে পারে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, সংকট কাটার অপেক্ষার পাশাপাশি জ্বালানি সাশ্রয় ছাড়া উপায় নেই। কারণ বাংলাদেশের এলপিজি, এলএনজি ও জ্বালানি তেলের বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শফিকুল আলম জুয়েল বলেন, বাংলাদেশ যেহেতু আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবহারকারী দেশ, তাই সাশ্রয়ী হওয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্রুড অয়েল আমদানির ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে আবুধাবীর হুজাইফা বন্দর ব্যবহার করা যেতে পারে। পাশাপাশি ফিনিশড অয়েল ও এলএনজি আমদানির জন্য বিকল্প দেশ খুঁজতে হবে। চট্টগ্রাম ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক জিএম প্রকৌশলী মনজারে খোরশেদ আলম বলেন, পেট্রোল ও ডিজেলের মতো পণ্যের জন্য চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা যেতে পারে। আর এলএনজির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশ বিবেচনায় আনা যেতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশের সব ধরনের জ্বালানি তেলে ২২ থেকে ৪৫ দিনের মজুত সক্ষমতা রয়েছে। এছাড়া দেশে এই মুহূর্তে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই।