
অক্টোবরের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ক্ষমতাসীন জোট পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর ইসরায়েলে নতুন সরকার গঠনের সুযোগ পেয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা গাদি আইজেনকোট। এর মাধ্যমে নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসনের অবসানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
গতকাল শনিবার (৭ নভেম্বর) রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শেষে প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ সাবেক সেনাপ্রধান আইজেনকোটকে সরকার গঠনের জন্য বেছে নেন। জোট বাধার জন্য আইজেনকোটকে ২৮ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে ব্যর্থ হলে তিনি আরও ১৪ দিনের বর্ধিত সময় চাইতে পারবেন।
দায়িত্ব পাওয়ার পর ‘ইয়াশার’ পার্টির প্রধান ৬৬ বছর বয়সী আইজেনকোট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লেখেন, এখনই সময় একটি জাতীয় জরুরি সরকার গঠনের। আমরা যেন এর যোগ্য হতে পারি, তার জন্য সবটুকু করব.
তবে জাতীয় নিরাপত্তা, ধর্ম ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখলদারিত্বের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে চরম মতবিরোধ থাকায় আইজেনকোটের সামনে পথটি অত্যন্ত জটিল। ইসরায়েলের ১২০ আসনের নেসেটে আইজেনকোট বা নেতানিয়াহু- কারোরই এককভাবে প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন নেই। ফলে সরকার গঠনে আরব দলগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আইজেনকোটের সামনে সরকার গঠনের সম্ভাব্য পথ ও চ্যালেঞ্জ :
ll
বিভক্ত বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ করার চ্যালেঞ্জ
আইজেনকোটের সম্ভাব্য জোটে রয়েছে তার নিজের ‘ইয়াশার’ পার্টি, ইয়ার গোলানের নেতৃত্বাধীন মধ্য-বামপন্থি ‘ডেমোক্র্যাটস’, নফতালি বেনেটের মধ্য-ডানপন্থি ‘টুগেদার’ এবং অ্যাভিগডোর লিবারম্যানের ডানপন্থি ‘ইসরায়েল আওয়ার হোম’। সব মিলিয়ে এই জোটের কাছে ৪৮টি আসন রয়েছে, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে বেশ দূরে।
অন্যদিকে, নির্বাচনে ১৯টি আসন পাওয়া আরব নেতৃত্বাধীন জোট ‘রাআম’ ও ‘জয়েন্ট লিস্ট’ (যার মধ্যে হাদাশ, তা’আল ও বালাদ অন্তর্ভুক্ত) আইজেনকোটকে প্রধানমন্ত্রী করার প্রচেষ্টাকে সমর্থন দিয়েছে। তাদের সমর্থনে নেতানিয়াহু-বিরোধী শিবিরের মোট আসন দাঁড়ায় ৬৭টিতে।
তবে আইজেনকোট তার কেবিনেটে আরব দলগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। অন্যদিকে লিবারম্যানও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে- তিনি আরব দলগুলোর বাইরের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল কোনো সংখ্যালঘু সরকারকে সমর্থন করবেন না। বিপরীতে ডেমোক্র্যাটস প্রধান ইয়ার গোলান আরব দলগুলোর সঙ্গে কাজ করার পক্ষে মত দিয়ে বলেন, নেতানিয়াহুর তৈরি করা ইহুদি ও আরব ভোটের বর্ণবাদী বিভাজন আমাদের আর গ্রহণ করা উচিত নয়।
নেতানিয়াহু জোটের বর্তমান আসন সমীকরণ
নেতানিয়াহুর ধর্মান্ধ-জাতীয়তাবাদী জোটের আসন সংখ্যা ২০২২ সালের ৬৪টি থেকে কমে ৫৩টিতে নেমে এসেছে, যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন থেকে ৮টি কম। তার দল লিকুদ এককভাবে ২৭টি আসন পেয়ে সবচেয়ে বড় দল হলেও আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টি পেয়েছে ২১টি আসন।
প্রেসিডেন্ট হারজোগের সঙ্গে সংলাপে নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের মিত্র কট্টর-অর্থোডক্স ‘ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইিজম’ পার্টি নেতানিয়াহু বা অন্য কাউকেই সমর্থন দেয়নি, যা নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় ফেরার আশাকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। তবে কট্টর-অর্থোডক্স ইহুদিদের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা বাতিলের দাবি মেনে নেওয়া হলে তারা ভবিষ্যতে নেতানিয়াহুকে সমর্থনের পথ খোলা রেখেছে।
সংখ্যালঘু সরকার কী ও তা কি সম্ভব?
আইজেনকোট যদি পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোট গঠনে ব্যর্থ হন, তবে বাইরে থেকে আরব দলগুলোর সমর্থনে তিনি একটি ‘সংখ্যালঘু সরকার’ পরিচালনা করতে পারেন।
সংখ্যালঘু সরকার হলো এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে কেবিনেটে থাকা দলগুলোর পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে না; তারা ক্ষমতায় থাকতে ও আইন পাস করতে বাইরের দলগুলোর ভোটের ওপর নির্ভর করে। এই প্রক্রিয়ায় ‘রাআম’ ও ‘জয়েন্ট লিস্ট’ সরকারে বা কেবিনেটে কোনো পদ না নিয়েও নীতিগত বিষয়ে সমঝোতার ভিত্তিতে বাইরে থেকে আইজেনকোটের চার-দলীয় জোটকে সমর্থন দিতে পারে।
এর আগে ২০২১ সালে নফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দিয়ে প্রথম কোনো স্বাধীন আরব দল হিসেবে ইতিহাস গড়েছিল ‘রাআম’ তবে দখলকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপন ও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন প্রশ্নে মতভেদের কারণে ১৮ মাস পরই সেই সরকারের পতন ঘটে।
সরকার গঠনের অন্য সম্ভাব্য বিকল্প পথসমূহ :
১. কট্টর-অর্থোডক্স দলগুলোকে জোটে আনা
কট্টর-অর্থোডক্স দুই দল- শাদ ও ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইিজমের রয়েছে ১৩টি আসন। এদের সঙ্গে নিতে পারলে আইজেনকোটের জোটের আসন সংখ্যা ঠিক ৬১টিতে পৌঁছাবে। তবে এজন্য তাদের ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদান থেকে ছাড় দিতে হবে- যে ছাড়ের কঠোর বিরোধী আইজেনকোট ও লিবারম্যান।
২. জাতীয় ঐক্যের সরকার
আইজেনকোটের ইয়াশার, বেনেটের টুগেদার, লিবারম্যানের দল ও নেতানিয়াহুর লিকুদ মিলে ৬৭ আসনের একটি ঐক্য সরকার গঠন সম্ভব। কিন্তু এজন্য আইজেনকোট ও তার সঙ্গীদের ‘নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার’ মূল নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসতে হবে।
আইজেনকোট নির্ধারিত সময়ে সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট হারজোগ নেতানিয়াহুকে সুযোগ দিতে পারেন। দুজনেই ব্যর্থ হলে পার্লামেন্ট অন্য কোনো প্রার্থী বেছে নেবে। ১০০ দিনের মধ্যে কোনো সমাধান না এলে ইসরায়েলকে আবারও নতুন নির্বাচনের মুখে পড়তে হবে।
কেন এই রাজনৈতিক সমঝোতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ?
এই আলোচনা কেবল কে প্রধানমন্ত্রী হবেন তা নির্ধারণ করবে না; বরং অর্থনীতি, সামরিক বাহিনীতে ধর্মীয়দের নিয়োগ ও দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড সংক্রান্ত নীতি কোন দিকে যাবে তাও নির্ধারণ করবে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী নফতালি বেনেট ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কঠোর বিরোধী ও পশ্চিম তীরের একটি বড় অংশ ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষপাতী।
সাবেক অর্থমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী অ্যাভিগডোর লিবারম্যানের দল পশ্চিম তীরে বিতর্কিত ‘ই-ওয়ান’ করিডোরসহ অন্যান্য অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ এবং ‘এরিয়া সি’ (পশ্চিম তীরের ৬০ শতাংশ এলাকা) ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত করার সমর্থন দিচ্ছে।
স্বয়ং আইজেনকোটও গাজায় নির্বিচারে হামলার নীতিতে সরাসরি বিরোধিতা না করলেও যুদ্ধ পরিচালনায় নেতানিয়াহুর কৌশলগত ব্যর্থতার সমালোচনা করেছেন। তিনি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণাটিকে ‘অবাস্তব’ বলে মনে করেন এবং পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি শক্তিশালী করার পক্ষে।