
অতীতের টানাপোড়েন ছাড়িয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে নতুন বাস্তবতায় পুনর্গঠন করতে চায় নয়াদিল্লি। ভারতের দৃষ্টিতে, পারস্পরিক মর্যাদা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাই হবে দুই দেশের আগামী দিনের সম্পর্কের মূল ভিত্তি।
নয়াদিল্লিতে সফররত বাংলাদেশি সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মতবিনিময়কালে সোমবার (৪ মে) ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি এসব কথা বলেন।
নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ছাড়াও খোলামেলা কথা বলেছেন ভারত সফররত সাংবাদিক প্রতিনিধিদলের সঙ্গে। নয়াদিল্লির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেড় ঘণ্টার আলাপচারিতায় বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নানা টানাপোড়েন যেমন উঠে এসেছে, তেমনি, যেকোনোভাবেই ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রত্যয় ছিল ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের কণ্ঠে।
বিক্রম মিশ্রি বলেন, ভারত এখন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে অতীতের টানাপোড়েনের সীমা ছাড়িয়ে আরও বাস্তববাদী, স্থিতিশীল ও ভবিষ্যতমুখী কাঠামোয় দেখতে চায়। দিল্লির দৃষ্টিতে, পারস্পরিক মর্যাদা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতাই হবে আগামী দিনের সম্পর্কের মূল ভিত্তি।
অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বাংলাদেশে বিতর্কিত নির্বাচনে ভারতের সহযোগিতার দাবি নাকচ করে দিয়ে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, বাংলাদেশের অতীতের বিতর্কিত নির্বাচনে ভারত কখনোই নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর অংশ ছিল না। যে সরকারই বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকবে, তার সঙ্গেই রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক বজায় রাখবে দিল্লি।
বিক্রম মিশ্রি বলেন, বাংলাদেশ যদি নিজস্ব অগ্রাধিকারের জায়গা থেকে সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে চায়, ভারত তাতে পূর্ণ প্রস্তুত। তার কথায়, দুই দেশের সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক বোঝাপড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি নিরাপত্তা, সংযোগ, জ্বালানি, পানি এবং বাণিজ্যসহ বহুমাত্রিক কৌশলগত বাস্তবতার অংশ।
তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে প্রশ্নে তিনি সরাসরি কোনো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি না দিলেও বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যমান যৌথ নদী কমিশন এবং কারিগরি আলোচনার পথেই অভিন্ন নদীর বিষয়গুলো সমাধান খুঁজে নেয়া হবে। একইভাবে গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়ন নিয়েও দিল্লি বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ধারাবাহিকতার উপর জোর দেয়।
ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব কৌশলী নীরবতা বজায় রাখেন। তবে তিনি পরিষ্কার করেন, বাংলাদেশ-সংক্রান্ত সব বিষয়ে ভারত বাস্তবসম্মত এবং দায়িত্বশীল যোগাযোগ বজায় রাখতে আগ্রহী।
আঞ্চলিক রাজনীতির সংবেদনশীল বিষয়েও বিক্রম মিশ্রি সতর্ক অবস্থান নেন। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার বিতর্কিত মন্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বক্তব্যকে বৃহত্তর কূটনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহ, বিশেষ করে ডিজেল সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়ে ভারত বোঝাতে চেয়েছে—বাংলাদেশ তার কাছে কেবল প্রতিবেশী নয়, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
বাণিজ্য সম্প্রসারণ, সেপা চুক্তি, সংযোগ এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব নিয়েও দিল্লির আগ্রহ স্পষ্ট। সব মিলিয়ে, এই আলোচনায় ভারতের বার্তা ছিল সুস্পষ্ট—বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে তারা নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় পুনর্গঠন করতে চায়, যেখানে কৌশলগত সহযোগিতা ও পারস্পরিক স্বার্থই হবে মূল চালিকাশক্তি।